নাইট ডিউটির কাহিনী
টানা দুইটা নাইট ডিউটি করলাম।
প্রথম নাইটে দেখা হলো বিএনপি ভাইদের সাথে।
৯ টায় আসলেন যুবদল নেতা।
১০ টায় আসলেন ছাত্রদল নেতা।
১১ টায় আসলেন স্বেচ্ছাসেবীদলের নেতা।
... এভাবে চলতেই থাকলো।
আমি সবাইকে বেশ আগ্রহ নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। আজকাল তো বিএনপি ভাইদের দেখাই যায়না। সেখানে ঘন্টায় ঘন্টায় তাঁদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!
সবারই একই কমপ্লেন, তাঁদেরকে মাইর দেয়া হয়েছে। প্রায় সবাই-ই রক্তাক্ত।
যাদের জখম নেই, তাঁরাও রক্তাক্ত।
কী আজব! জখম ছাড়া রক্ত আসলো কীভাবে!
একটু খুটিয়ে দেখার পর ঘটনা বুঝা গেলো। আসলে রক্তাক্ত হয় একজন। ঐ একজনের রক্ত বাকিরা মেখে চলে আসে। মানে হলো - যত বেশি রক্ত, মামলা ততো শক্ত! তাই এই মাখামাখি! প্রতিপক্ষকে সাইজ করার অব্যর্থ আয়োজন।
আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এই এলাকা বিএনপির দখলে।
ভুল ভাঙ্গলো দ্বিতীয় রাতে এসে।
৯ টায় আসলেন যুবলীগ নেতা।
১০ টায় আসলেন ছাত্রলীগ নেতা।
১১ টায় আসলেন তাতীলীগ নেতা।
... এভাবে চলতেই থাকলো।
একই কমপ্লেন। প্রতিপক্ষ মাইর দিয়েছে।
তবে এই পার্টির রক্ত বের হয়েছে কম। ক্ষমতাসীন দল, তাই হয়তো। রক্ত বের না হলেও তাঁদের শরীরে অনেক আঘাত।
পুরো শরীর দেখিয়ে এক ভাই বললেন, 'এখানে... এখানে... এখানে... সবখানে মেরেছে। এই দেখেন কালো হয়ে ফুলে আছে।'
আমি ভালো করে দেখলাম। কিচ্ছু নাই।
চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলাম, 'কই? কিছু তো দেখিনা।'
উত্তরে তিনি আমার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকালেন তাঁতে আমার ডাক্তারি সার্টিফিকেট প্রশ্নের মুখে পড়ে গেলো। আমি নিজেও নিজের চোখ নিয়ে সন্দেহে পড়ে গেলাম।
তাতীলীগের ভাইটি তার সুস্থ স্বাভাবিক গলা দেখিয়ে বললেন, 'এই দেখেন গলার অবস্থা। আমাকে ফাঁস দিয়ে মারার চেষ্টা করেছে। এমনভাবে লিখে দেন যাতে শালারপুতরে মার্ডার কেইসে ঢুকাইয়া দিতে পারি!'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'মার্ডার কেইস কীভাবে দিবেন? আপনি তো মরেন নাই!'
এই ভাইও আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। যে দৃষ্টির অর্থ হলো - আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি খুব দ্রুত টের পাবা।
যাই হোক, এখানে পলিটিকাল মারামারি ছাড়া পারিবারিক মারামারিও অনেক।
রাতকে যদি আমরা তিনভাগে ভাগ করি তাহলে প্রথম অংশে এই এলাকার পুরুষরা বৌ পেটায়। বৌ'রা ফোলা চোখমুখ নিয়ে আসেন। জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন, 'জামাই পিটাইছে।'
রাতের দ্বিতীয় অংশে এরা ছোটভাইয়ের বউকে পেটায়। চোখ মুখ ফোলা নারীরা উত্তর দেন, 'ভাসুর পিটাইছে।'
শেষ রাতের দিকে মার খেয়ে যারা আসেন তাঁদের ব্যাপারটা অদ্ভুত। 'কে মারলো?' এইটা জিজ্ঞেস করলে তাঁরা উত্তর দেন, 'জানিনা। হালকা ঘুমাইছিলাম। উঠে দেখি কে জানি মেরে চলে গেছে।'
ভোরের দিকে আমি নিজে একটু ঘুমিয়েছিলাম। উঠে দেখি, ঘাড়ে প্রচন্ড ব্যাথা। এক সুতাও মাথা নাড়াতে পারছিনা।
আম্মাকে ফোন দিলাম।
আম্মা ঝাড়ি দিলেন, 'তোরে বললাম, বাসা থেকে বালিশ নিয়ে যা। উলটাপালটা বালিশে ব্যাকা হয়ে ঘুমাইছিস। এখন মজা বুঝ।'
আমি চুপ মেরে শুনে গেলাম। ভাবলাম, একবার বলি, 'আম্মা, যে এলাকায় মানুষ স্বপ্নের মধ্যে মাইর খায়, মাইর দেয়, সেখানে সব দোষ বেচারা বালিশের উপর দেয়াটা ঠিক হচ্ছেনা।'
© ডা. আলিম আল রাজি