যারা ডাক্তার হতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা!
-ইন্টার্নির সময়, গাইনি ওয়ার্ডের নবজাতক শিশু ছেলের কৃষক বাবা; একটা কাগজ দিয়ে বলেছিলেন “স্যার আপনার নামটা একটু লিখে দেন প্লিজ”।
“কেন??”
হাত ধরে বললেন, “বাড়িতে গিয়ে হুজুর ডেকে ছেলের নাম রাখব। আপনার নামটাই রাখব!!”
-আরেক রুগীর স্ত্রী একদিন ডেকে আমার হাতে দুটা বড় বড় ফজমি আম ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “আপনি অনেক কষ্ট করেছেন। আমার দেওয়ার মত তেমন কিছু নেই। আম দুটা রাখেন প্লিজ”। আম দেখে বন্ধুরা অনেক হাসাহাসি করল। আমি কিন্তু সেটার ছবি তুলে রেখে দিলাম।
“There is a story behind every picture.”
-পোষ্ট অপারেটিভের একটা খারাপ রুগীকে সারারাত পাহারা দিয়ে রাখার পরে রাত ৪ টার দিকে চাচা আমার হাত ধরে বললেন কানের কাছে বললেন, “বাবা থাক, অনেক কস্ট করছেন। আপনি এখন গিয়ে ঘুমান; আমি ভাল আছি এখন” যদি তিনি ভাল নেই এই কথা আমিও জানি উনিও জানেন।
... ... ...
আমাদের প্রত্যেক ডাক্তারের জীবনে এমন অনেক দৃশ্য আছে যেটা আপনার কয়েক বছরের দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারবে। জীবন বাচনোর গল্প, সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে সকালে হাসির গল্প……
তারপরেও আমরা হতাশ; ফার্স্ট ইয়ারের পিচ্ছিগুলার আইটেম থেকে শুরু করে মিড লেভেল ডিগ্রী আর প্রফেসর সাহেবের চ্যম্বারের সামনের কম ভিড়, সবাই কম বেশি হতাশ।
তারপরেও আমরা বসে থাকি; রুগীর গালি খাই, কখনও মারও খাই, তবুও মাথা গুজে পড়ে থাকি। আমাদের রাতগুলো হারিয়ে যায় ব্যস্ততায়, ইমার্জেন্সির চেয়ারে। সময়গুলো পচে যায় নাইট ডিউটিতে, রুগীর গালিতে।
... ... ...
পহেলা বৈশাখে দেখেছি এক ভাই ১৪ এপ্রিলের ছুটির জন্য হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে। পহেলা বৈশাখে প্রিয় মানুষটির কাছে তার যাওয়া হবে না! অথচ ষোল কোটি বাঙলী উৎসব করবে সেদিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে অনেকে হলুধ শাড়ী পরিহিতার হাত ধরে টিএসসিতে যাবে। জীবনে রং এর শেষ নেই। এ রংএ ফুচকা আছে, আইসক্রিম আছে, হুড তোলা রিক্সা ও আছে।
উৎসবে আমরা হাসপাতালে তালা মারতে পারি না। কিছু ডাকাত রাত জেগে বসে থাকে। এদের উৎসব নেই, এদের প্রিয় কেউ নেই; এরা বর্নান্ধ। এদের চোখে কোন রং থাকে না।
... ... ...
এক বন্ধু নিজের জন্মদিনের দিনে ডিউটি। বেচারা নতুন বিয়ে করেছে। নব দম্পতির জন্য জন্মদিন ঈদের থেকেও বেশী কিছু। জানিনা তার ঈদ আসবে কিনা।
কষাইদের আসলে ঈদ নেই। এক ঈদের নামাজের ঠিক কিছু ঘন্টা আগে, মেশিনে পায়ের রগ কেটে এক শ্রমিক আসল। ছোট খাটো একটা অপারেশন করে বের হবো ঠিক এমন সময় একটা ইমারজেন্সি প্রেগন্যান্ট রুগি আসল। অত্যন্ত গরীব রুগী।
আমার ডিউটি সময় শেষ, ঈদের নামাজ। বের হয়ে জাচ্ছিলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবলাম, মর্নিং ডিউটি যে আপুর উনি আসেন নাই, টাইমলি কোন দিনও আসেন নাই, সম্ভাবনাও নাই। গাইনি ম্যাডাম নরমালি সিস্টার নিয়ে অটি করেন। আজকে ঐ সিস্টার ছুটিতে। অ্যাসিস্ট করবে কে? আমি চলে গেলে আর কেউ নাই অ্যাসিস্ট করার জন্য। ফেরত গেলাম রুমে। ম্যাডাম আসল, ওয়াশ নিলাম।
ম্যাডামের সাথে সিজার অ্যাসিস্ট করা সময় বলল, “নামায পড়বা না?
বললাম, “নামায শেষ”।
অবাক হয়ে বললেন, “ঈদের নামায পড়লা না এইটা কেমন কথা”
মনে মনে বললাম, ঠিক মত হাটতে শিখার পরে এই প্রথম কোন ঈদের নামাজ পড়া হয়নি। অপারেশনের একটা টাকাও আমার পকেটে ঢুকবে না। তার পরেও থেকে গেলাম অপারেশন করতে শুধু মাত্র রুগীটার জন্য।
অপারেশন শেষ করে যখন বাসায় ফিরছি লক্ষ্য করে দেখলাম সবাই পাঞ্জাবি আর রঙিন শাড়ি পরে ঘুরছে। আর আমি তীব্র ক্লান্ত শরীরে, ব্যাগ হাতে, অর্ধেক শার্ট প্যান্টের ভিতরে, উশখুশ চুলে বাড়ি জাচ্ছি।
তখন মনে মনে বলাম, আল্লাহ হয়ত আমাকে এই দিনের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এটাই আমার ঈদ।
“HAPPY DOCTORS DAY” 🖤
-ডা: মো: কামরুজ্জামান।