তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয় হব~
একবার সাহাবীদের ভীড়ে নবীজী ﷺ উমার ইব্নু খাত্তাব (রাঃ) এর হাত ধরেছিলেন। উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন,
"হে আল্লাহ্র রসূল!
আমার জান ছাড়া আপনি আমার কাছে সব কিছু চেয়ে অধিক প্রিয়।"
তখন নবীজী ﷺ বললেন,
"না, যাঁর হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! তোমার কাছে আমি যেন তোমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় হই।"
তখন উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন,
"আল্লাহ্র কসম!
এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়।"
নবীজী ﷺ তখন বললেন,
"হে উমর!
এখন তুমি সত্যিকার ইমানদার হলে।"[১]
নবীজী ﷺ এর প্রতি আমাদের ভালোবাসার জায়গা কিরূপ হওয়া দরকার তা উমার রা এর সাথে নবীজী ﷺ এর এই কথোপকথনে স্পষ্ট। নবীজী ﷺ কে আল্লাহ পাক সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন।তিনি এতোটাই সম্মানিত যে অন্যান্য নবী-রাসুলগণ মুহাম্মদ ﷺ এর উম্মতদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য দুআ করেছেন আর তাদের মধ্যে কেবল নবী ঈসা (আ:) এর দু'আ আল্লাহ পাক কবুল করেছেন।তাঁকে শেষ জামানায় আবার যখন পৃথিবীতে পাঠানো হবে তখন তিনি নবীজী ﷺ এর উম্মতদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নবীজী ﷺ কে লক্ষ্য করে বলেছেন,
"হে নবী!
আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের জন্য কেবল রহমত করেই পাঠিয়েছি।"[২]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ত্ববারী রাহ. বলেছেন,
"নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জগতের সকলের প্রতি আল্লাহ পাকের রহমত। মুমিন-কাফির নির্বিশেষে সকল মাখলুকই কিয়ামত পর্যন্ত এই মহান রহমতের মাধ্যমে উপকৃত হতে থাকবে।
মুমিনকে তো আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে হিদায়াত দান করেছেন। তাঁর উপর ঈমান আনা এবং তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে পয়গাম নিয়ে এসেছেন সে অনুযায়ী আমল করার কারণে তাকে জান্নাত দেবেন। আর এই উম্মতের অবিশ্বাসীকে তাঁর কারণে পূর্ববর্তী উম্মতের অবিশ্বাসীর মতো নগদ শাস্তি দেবেন না।"[৩]
অর্থাৎ,আমরা মুসলমানসহ বর্তমান পৃথিবীতে অবস্থানকারী সকল নারী-পুরুষ এই মানুষটির উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি যার উম্মত হওয়ার জন্য আল্লাহর প্রিয়তম বান্দারা আবেদন জানিয়েছিলেন। নবীজী ﷺ শুধু আমাদের মুসলমানদের জন্য না বরং বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সকলের জন্য রহমত।
অথচ এই আমাদেরই মধ্যে যারা ইসলামকে অস্বীকার করেছে,ইসলাম হতে বিচ্যুত হয়েছে তারা নবীজী ﷺ কে নিয়ে উপহাস করছে,হাসি তামাশা করছে!
নাঊযুবিল্লাহ!
অথচ আল্লাহ পাক মানবজাতির জন্য ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
"নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজদের চেয়ে ঘনিষ্ঠতর।"[৪]
এই জনগোষ্ঠী ইসলামকে স্বীকার করবে না,সরল পথের সন্ধান পেয়েও সেই পথে হাঁটবে না, নবীজী ﷺ এর মতো সর্বোত্তম মানুষের জীবনাদর্শ পেয়েও তারা গ্রহণ করবে না।
মহান আল্লাহ পাক তো তাদের ব্যাপারে বলেই দিয়েছেন,
"তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না,
তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না
এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না।
এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত! তারাই হল উদাসীন।"[৫]
চোখ থাকতেও তারা দেখছে না,কান থাকতেও শুনছে না আর মুখ থাকতে ও স্বীকার করছে না। আচ্ছা ঠিক আছে আপনারা এই দলের অন্তর্ভুক্ত হন কিন্তু এই বলে সীমা অতিক্রম করে যাবেন!
ফ্রান্সের ইসলামবিরোধীতা সেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ইসলামী খিলাফতের আমলে তারা বিভিন্ন সময়েই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করেছে, বেশ কিছু ক্রুসেড তথা ধর্মযুদ্ধেও তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিলো।
সেই ফ্রান্স আজও থেমে নেই,আজকের জামানায় তারা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে মিডিয়া ও নিউজ পোর্টালগুলোকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বোনাস।
শার্লি হেব্দো ম্যাগাজিনটি বরাবরই ফ্রান্সের এরূপ কর্মকান্ডের প্রকাশ্য সাহায্যকারী। নবীজী ﷺ ও ইসলামের নানাবিধ ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশ করে তারা সবসময়ই নিজেদের তথাকথিত বাকস্বাধীনতা প্রকাশ করে।
ফরাসি মিডিয়া ও প্রেসিডেন্ট একে "ব্যাক্তিস্বাধীনতা" বললেও, কিন্তু ভাই একে আমরা উগ্রতা বলবো।
আপনি বেছে বেছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করবেন আর ব্যাক্তিস্বাধীনতা বলে বেড়াবেন তা কোনো ভাবেই মুসলিমরা মেনে নিবে না কেননা,আমরা সেই উম্মতদের অন্তর্ভুক্ত যাদের নেতা উমার (রা) এবং উমার (রা) এর মতো আমাদের নিকট নবীজী ﷺ সম্মানিত, ভালোবাসার চূড়ায় তাঁর স্থান। নবীজী ﷺ এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা হচ্ছে আমাদের ঈমানের বহিঃপ্রকাশ কেননা নবীজী ﷺ বলেছেন,
"তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয় হব।"[৬]
তাই ঈমানী দায়িত্ব থেকেই আমরা মুসলিম উম্মাহ কাফেরদের এরূপ আচরণের প্রতিবাদ জানাবো। ইসলামী খিলাফতব্যাবস্থা নেই বলে কাফেররা যেন না ভাবে যে আমরা যুদ্ধ করতে জানি না, প্রতিবাদ করতে জানি না।তারা কাগজে কলমে যুদ্ধ করছে, আমরাও কাগজে কলমে করবো,লেখা দিয়ে নিন্দা জানাবো। কেননা ঈমানের প্রশ্নে স্বয়ং নবীজী ﷺ বলেছেন,
"তোমাদের কেউ যদি কোনো খারাপ কাজ বা বিষয় দেখে তাহলে সে যেন হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়,
যদি তা করতে অপারগ হয় তাহলে যেন মুখ দিয়ে তার প্রতিবাদ করে,
যদি তাও করতে সক্ষম না হয় তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে, আর এটাই হচ্ছে ঈমানের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলতম স্তর।"[৭]
বিগত সময়ে ডেনমার্কে ২০০৪ এ, আমেরিকায় ২০১২ তে এবং ২০২০ এ নরওয়েতে ও ফ্রান্সের মতো ইসলাম বিদ্বেষী আচরণ হয়েছিল কিন্তু মুসলমানদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ তাদের নতি স্বীকারে বাধ্য করেছিল।
অতএব ভারতের ইসলামবিদ্বেষী মন্ত্রীগুলো সীমা অতিক্রম করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও ইতিহাস যেন তারা স্মরণে রাখে যে ইতিহাসে যুগে যুগে ইসলামের অবমাননাকারীদের শেষটা কখনোই ভালো ছিলোনা।
[১] সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬৬৩২
[২]সূরা আম্বিয়া: আয়াত নং ১০৭
[৩] তাফসীরে ত্ববারী ১৮/৫৫২
[৪] সূরা আল আহযাব: আয়াত নং ০৬
[৫] সূরা আল আ'রাফ: আয়াত নং ১৭৯
[৬] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫
[৭] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ১৯৪
|| নবীজী ﷺ এর প্রতি ভালোবাসার স্বরূপ এবং উম্মাহর প্রতিবাদনামা ||
মাহিনুর রহমান
১০.০৬.২২