ঘুম!!!
সাধারণ কথাবার্তায় আমরা বলি, ঘুমের মানুষ আর মৃত মানুষ সমান। ঘুম অর্ধেক মৃত্যু। ঘুমিয়ে গেলে আমরা দিশা হারিয়ে ফেলি, সচেতনতাবোধ শিথিল হয়ে আসে। সজাগ হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় এলার্মের, সেই এলার্মের শব্দও দিতে হয় তীক্ষ্ম, অনেক রকমের।
সাধারণ মানুষের অবস্থা এমন হবেই। কিন্তু আমি এখন বলছি অসাধারণ মানবের কথা। যার জন্য প্রয়োজন ছিলো না কোন এলার্মের, কোন রিমাইন্ডারের। বরং তিনি তাঁর জীবদ্দশায় যেন সদা জাগরুক। সে আবার কেমন? তিনি ঘুমাতেন না?
অবশ্যই ঘুমাতেন। কিন্তু ঘুমাতো কেবল চর্মচক্ষু। কিন্তু তাঁর সচেতনতাবোধ থাকতো সচল, অনুভূতি থাকতো সজাগ অর্থাৎ, অন্তর থাকতো জাগ্রত। বন্ধ চোখেও তাই তাঁর জ্ঞান এড়িয়ে যেতো না কোন কিছু।
সে কেমন ছিলো? এর আগে একটা হাদীস শুনি এসো। স্বয়ং তাঁর মুখনিঃসৃত কথাতেই শুনি তাঁর এ অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা।
একদিন আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিতর আদায় না করেই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আম্মাজান আয়শা রা. জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বিতর না পড়েই ঘুমিয়ে যাবেন?' অর্থাৎ, যদি ঘুমে থাকতে থাকতেই ওয়াক্ত পার হয়ে যায় আর আপনি টের না পান? আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, 'ঘুমায় তো কেবল আমার চোখ দু'টো; অন্তর তো ঘুমায় না।'
সুবহানাল্লাহ!
সীরাত পড়লে দেখবে একবার যাদু করা হয়েছিলো সর্বশ্রেষ্ঠ এই মানবকে। যাদুর প্রতিক্রিয়াও ছিল বড় কষ্টদায়ক। খেলেও তাঁর মনে থাকতো না যে, তিনি খেয়েছেন। সালাত আদায় করলেও তা খেয়াল থাকতো না। বরং কেমন এক অস্থির দিনযাপন করছিলেন। তো, এ অবস্থায়ই একদিন তিনি ঘুমালেন। বিশেষ ঘুম, যে ঘুমে চোখ থাকে বিশ্রামে, কিন্তু অন্তর মগ্ন তার কাজে।
তিনি ঘুমানোর পর তাঁর কাছে দুইজন ফেরেশতা আসলেন। একজন মাথার কাছে, আরেকজন পায়ের দিকে বসলেন। মাথার কাছের জন প্রশ্ন করলেন - লোকটির কিসের ব্যাথা?
- লোকটিকে যাদু করা হয়েছে।
- কে যাদু করেছে?
-- লাবীদ বিন আসাম।
-- কী দিয়ে যাদু করেছে?
- চিরুনী, মাথা বা দাড়ির চুল ও পুরুষ খেজুর গাছের মোচার খোসা দ্বারা।
-- তা কোথায়?
-- যারওয়ান কূপে।
ব্যস, তা উদ্ধার হয়ে গেলো এবং আল্লাহর রাসূল যাদুর কষ্ট থেকে মুক্তি পেলেন।
তো, এখন প্রশ্ন হলো, এই ফেরেশতা দুইজনের কথা আল্লাহর রাসূল বুঝলেন কিভাবে, তিনি তো ঘুমে ছিলেন?
বন্ধু! অন্তর তো সজাগ ছিলো। সে তার কাজ করেছে, সব তথ্য সংরক্ষণ করেছে।
সুবহানাল্লাহ! কী দারুণ এক অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা!
এ সজাগ অন্তর তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হতে দিতো না, তাঁর ইবাদাতের কথা ভুলতে দিতো না, সব সময় তা লেগে থাকতো স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের যিকিরে, ইবাদাতের ফিকিরে।
এ অন্তর কেন এত সজাগ থাকতো?
আহ! তুমি কি জানো না, আল্লাহর স্মরণে পূর্ণ হৃদয় জীবিত হৃদয়? যে অন্তরে প্রাণের শক্তি বেশি, সে অন্তর দেহ ঘুমালেও ঘুমিয়ে পড়ে না, সজাগ থাকে নিরন্তর।
সজাগ হৃদয়ের অধিকারীকে ভালোবেসে আমরা কী করে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকি? কোন লোভে আমাদের অন্তরগুলো হারিয়ে ফেলে ইবাদাতের আকর্ষণ? কেন অন্তরটা ক্রমেই এগিয়ে যায় মৃত্যুর পথে?
অথচ এ অন্তর তো জীবিত থাকার অন্তর, উজ্জীবিত হৃদয়ে পবিত্র ভালোবাসার বীজ বোনার অন্তর। আর কবে বন্ধু? আর কবে?
- 'প্রাণের চেয়ে প্রিয়' থেকে