নববর্ষ ও সালাফে সলেহিন!

পৌত্তলিক সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের সংঘাত কেবল বাংলা অঞ্চলে নয়; পৃথিবীর নানান অঞ্চলে বিদ্যমান। ফলে এই সংঘাতের প্রকৃতি, পরিণতি, প্রতিরোধের ব্যবস্থা বুঝতে বাঙালী মুসলমানরা অন্যান্য ভূখণ্ডের মুসলমানদের সহায়তা নিতে পারে। এই ক্ষেত্রে পারস্য উত্তম উদাহরণ। কারণ ইসলামের শুরু থেকেই এই ভূখণ্ড ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। খোদ সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীরা তাদেরকে দেখেছেন, তাদের সঙ্গে মিশেছেন, শাসন করেছেন, সামাজিক ও ধর্মীয় নানা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও মতামত পেশ করেছেন। ফলে এই অঞ্চলের সংকটপূর্ণ জায়গাগুলো বুঝতে পারস্য সভ্যতায় দৃষ্টি দেয়ার বিকল্প নেই। অতীতে এমন ছিলও। ভারতবর্ষে যখন হিন্দুদের ওপর জিযইয়া আরোপের প্রশ্ন ওঠে, তখন পারস্যের অগ্নিপূজারীদের ওপর জিযইয়া আরোপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। 
এবার আসি নববর্ষ উদযাপন নিয়ে। বাংলা নববর্ষ নিয়ে সালাফের আলিমদের বক্তব্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু পারসিক নববর্ষ (নওরোয) ইসলামের আগ থেকেই বিদ্যমান। ফলে এব্যাপারে প্রথম যুগের কর্মপদ্ধতি আমাদের সামনে বিদ্যমান। মুসলমানগণ এক্ষেত্রে দু'টো কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। এক. সৌজন্যমূলক। এটা ছিল দুনিয়াদার ও শাসকদের। দুই. শরীয়তভিত্তিক ও প্রত্যাখ্যানমূলক। এই কর্মপদ্ধতি ছিল সালাফের। হাজ্জাজ বিন ইউসুফসহ উমাইয়্যাদের অনেক নেতারা নববর্ষের দিন পারস্য নেতাদের নানান উপঢৌকন পাঠাতো। উমর ইবনে আব্দুল আযীয এসে সেগুলো বন্ধ করে দেন। এজন্যই তিনি খলীফায়ে রাশেদ, উমাইয়্যাহদের বড় অংশ জবরদখলকারী জালেম ও ফাসেক। তুর্কি ও পারসিকদের প্রভাব ভারতবর্ষের মুসলমানদের মাঝেও নববর্ষ উদযাপন প্রচলিত ছিল। বুযুর্গ বাদশাহ আলমগীর (র.) এসে সেটাকে অনৈসলামিক গণ্য করে বন্ধ করে দেন। 

তথাপি আজও 'হাজার বছরের লোক সংস্কৃতি হিসেবে' ইরাক, ইরান ও আফগানিস্তানের একদল মুসলিম এটা পালন করেন। এই দিনে ভালো খাবার রান্না করেন। কুরআন তিলাওয়াত করেন। অর্থা‌ৎ জাহেলী নববর্ষের ওপর ইসলামের লেবাস পরিয়ে বৈধতা দানের চেষ্টা। ঠিক যেমন প্রচেষ্টা বাংলা নববর্ষের ক্ষেত্রেও চোখে পড়ে। স্বস্তির বিষয় হলো, এই বিষয়ে আমাদের সালাফের অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে ফলে নিষ্ঠাবান মুসলমানদের জন্য দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার প্রয়োজন নেই। কিছু বক্তব্য উল্লেখ করছি: 

১/ আলী (রা.) কে নববর্ষ উপলক্ষে পারসিক অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উপহার দেয়া হলে তিনি বললেন, এটা কেন? তাকে বলা হলো, 'নওরোয' উপলক্ষে। তিনি অপছন্দ করলেন। বললেন, 'তাহলে প্রতিদিন হাদিয়া দাও'। অন্য বর্ণনায় এসেছে তিনি বললেন, 'আমাদের নববর্ষ প্রতিদিনই'। তবে লক্ষণীয় হলো তিনি সৌজন্যবশত উপহার গ্রহণ করলেও অপছন্দ প্রকাশে 'নওরোয' শব্দটাও মুখে উচ্চারণ করেননি। [সুনানে কুবরা, বাইহাকী ১৯/১৬৮] 

২/ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি পারস্যে থাকাকালে তাদের নওরোযে (নববর্ষ) অংশগ্রহণ করবে, তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, এমন অবস্থায় মৃত্যু হলে তার হাশর হবে তাদের সঙ্গে'। [আহকামু আহলিয যিম্মাহ ৩/১২৪৮] 

৩/ হানাফী আলিমগণের ফাতাওয়া হলো, 'যদি কেউ অগ্নিপূজারীদের নববর্ষের দিন তাদের সঙ্গে বের হয়, তারা যা করে সেগুলোতে অংশ নেয়, নববর্ষ উপলক্ষে সেটার সম্মানে কোনো জিনিস ক্রয় করে, তবে এমন ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যাবে'! [আল-বাহরুর রায়েক ৫/১৩৩] 

৪/ আলিমগণ আরও লিখেছেন, 'নববর্ষের দিনগুলোতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দফ বাজানোও হালাল নয়'। [আল-বাহরুর রায়েক ৫৬]

৫/ হানাফী আলিমদের ঐতিহাসিক ফাতাওয়া: 'যদি কোনো ব্যক্তি অমুসলিমদের মতো (নওরোয) নববর্ষকে সম্মান করে সেদিন বিশেষ কিছু কেনাকাটা করে যা সাধারণ দিনে কিনতো না, কুফর গণ্য হবে। যদি সেদিনের সম্মানে কাউকে কিছু উপহার দেয় সেটাও কুফর হবে। কিন্তু এমনিতে অভ্যাসগত কারণে দিলে কুফর হবে না (গুনাহ হবে)। মোটকথা, নববর্ষের দিন এমন কিছু করা নিষিদ্ধ যা এই দিনের আগ বা পরে করা হয় না। ইমাম আবু জাফর কাবীর থেকে বর্ণিত, যদি কোনো মুসলিম পঞ্চাশ বছর আল্লাহর ইবাদতে ডুবে থেকে নববর্ষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কোনো অমুসলিমকে একটি ডিমও উপহার দেয়, তার সব ইবাদত বাতিল হয়ে যাবে। সে কাফের হয়ে যাবে'। [ফাতাওয়ায়ে কাযীখান: ৩/৩৬২] 

সাহাবী, তাবেয়ী ও সালাফ থেকে এধরনের বক্তব্যের অভাব নেই। তারা নওরোয তথা পারসিক নববর্ষের ব্যাপারে যা বলেছেন, বাংলা নববর্ষ এবং পৃথিবীর অন্যান্য সকল ভূখণ্ডের স্থানীয় ক্যালেন্ডারের নববর্ষ (যা মূলত ইসলামপূর্ব জাহেলী পঞ্জিকা) সর্বত্র প্রযোজ্য। ফলে পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো ক্যালেন্ডারের নববর্ষ পালন বৈধ নয়। মুসলমানদের সকল উদযাপন স্রেফ চন্দ্রবর্ষ তথা হিজরী ক্যালেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত। 

এটা স্রেফ ফাতাওয়া নয়; জগতের সকল ধর্ম-দর্শন থেকে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য, সকল আচার-অভ্যাসের ওপর ইসলামের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, জগতের সকল ভূখণ্ডের সকল মানুষ ও তাদের দিনক্ষণ, তাদের সকল উ‌ৎসব ও আয়োজনের ওপর আসমানী শরীয়াহর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাকসাদ যার অন্তরে জাগ্রত, তাকে এর চেয়ে বেশি বুঝানো নিষ্প্রয়োজন। কথিত প্রগতিশীলরা ইসলামের এই আধিপত্য চায় না। পৌত্তলিকতার আধিপত্য চায়। কিন্তু সেটা সরাসরি বলতে না পেরে 'প্রাচীন বাঙালি সংস্কৃতি'কে ঢাল হিসেবে পেশ করে।  

বাকি থাকলো ইসলামী তরীকায় নববর্ষ পালনের মাধ্যমে শাহ*বাগীদের জবাব দেয়া। সেটাও সম্ভব নয়। কারণ ইসলামে এর ভিত্তিই নেই। ইসলামী তরীকা প্রয়োগ করা হবে কিসের ওপর? হানাফী মাযহাবের সর্বসম্মত ফাতাওয়া হলো, 'নওরোয' তথা নববর্ষ পালন স্বরূপ সেদিন স্বতন্ত্রভাবে রোযা রাখাও মাকরূহে তাহরীমী'। [নূরুল ঈযাহ ১২৭] একই নীতিতে পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা যেমন নিষিদ্ধ, তেমন নিষিদ্ধ এই উপলক্ষে বিশেষ রোজা, নামাজ, তিলাওয়াত কিংবা মাহফিলের মতো ইবাদতও। ইসলামী বৈশাখ বলতে ইসলামে কিছু নেই। ফলে বৈশাখ পালনকে একবাক্যে 'না' বলা আবশ্যক।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url