সাদা এপ্রোন-১

 সাদা এপ্রোন (১) 

_

সকালে ফজর বাদ মা'মূলাত শেষে যখন বের হয়েছি, হঠাৎ-বৃষ্টি এক জায়গায় আমাকে আটকে দিলো। চায়ের দোকানের পাতা বেঞ্চিতে আমি বসে পড়লাম। এই ধরনের মূহুর্তগুলোতে মন কেন যেন স্মৃতিকাতর হয়ে উঠে। অনেক অনেক আগে হারিয়ে যাওয়া জীবনের কিছু মূহুর্ত কিভাবে যেন জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভাসে। আমিও আমার অতীতের এক 'আমিকে স্মৃতিপটে দেখলাম। সেই আমি'র বয়স উনিশ।

এখনকার আমিটা চল্লিশ পেরিয়েছে। সেই 'আমি' এবং আজকের এই 'আমি'তে অনেক তফাৎ। সেই 'আমি'টা তখন সদ্য মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। সাদা এপ্রোন গায়ে জড়িয়ে রিক্সাযোগে চলছে তার স্বপ্নের ক্যাম্পাসে। হঠাৎ করে নিজের কাছে বেড়ে গেছে তার দাম। নিজেকে মনে হচ্ছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কি বিশেষ অর্জন যেন তার হয়ে গেছে। কিন্তু সে কি জানে অর্জনটা এখনও সম্পূর্ণ নয়? সে কি জানে অনেক কঠিন এক পথ তাকে পাড়ি দিতে হবে? 

সেই কঠিন পথ ধরে চললাম আমিও। প্রথম দিনের আনন্দগুলো কেমন যেন মিইয়ে পড়েছে টানা আইটেমের কষ্টে। এই কষ্টের সাথে যোগ হয়েছে আরও কিছু উপরি কষ্ট। এই কষ্ট মানুষের তৈরি। কয়েকদিনের মধ্যেই আমি নিজের ভিন্ন এক পরিচয় পেলাম। আমি নাকি 'মাছ' কিংবা কারও ভাষায় 'মুরগী'। মাছ কিংবা মুরগী ধরার এক আয়োজনে আমাকে নিয়ে চলছে টানাটানি। এই টানাটানি সুখকর নয়। 

আমাকে নিয়ে টানাটানির উপসংহারটা ভিন্ন ধরনের এক অনন্য প্রাপ্তির কারন হলো। আমি এক নতুন জগতে প্রবেশ করলাম। এই জগত ভুলভাঙার জগত। নিজেকে নতুন করে চেনার জগত। এ আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার এক উপাখ্যান। 

আমি বরাবরই ভালো ছাত্রদের একজন ছিলাম। ঐ লেভেলের ভালো ছাত্র যাদের রেজাল্ট শুনার জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকে। কিন্তু বারে বারে মেরিটলিস্টে স্থান পাওয়াও আমাকে তৃপ্ত করতে পারে নি। সেই প্রাপ্তির মাঝে বরাবরই বিরাজ করতো কিসের যেন শূণ্যতা। কিসের যেন অপূর্ণতা। আমি জানতে পেরেছিলাম সেই অপূর্ণতার কারণ এবং সেই শূণ্যতা দূরীকরণের উপায়। আমার রবের শোকর, সেই পূর্ণতার রাস্তা আমি খুঁজে পেয়েছিলাম। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করা হয় নি নিশ্চিত। নিজের অযোগ্যতা ও অলসতার সেই কাব্য শুনিয়ে কী লাভ! কিন্তু তারপরও আমার রব আলোর সন্ধানে ছুটে চলার এই পথে তো আমাকে তুলেছিলেন! 

আমি জানি, আজও সেই আমার উনিশ বছরের 'আমি'টার মতো অনেকেই মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। আমি কি তাদেরকে কিছু বলতে চাই? বলা হোক আর না হোক, আমি চাই তারাও পেয়ে যাক সেই গন্তব্যের নাগাল, যে পথে চিরন্তন সফলতা উঁকি দেয়। নেমে আসে জান্নাতুল ফেরদাউসের বাশারাত। 

হে আমার ঐ ভাইটি ( এবং বোনটি) ! যে গায়ে সাদা এপ্রোন জড়াতে যাচ্ছো, যে প্রাপ্তির আনন্দে এখন হাবুডুবু খাচ্ছো! তোমার উদ্দেশ্যে আমাকে কিছু কথা বলতেই হবে। কতটুকু উপকারী কথাই বা আমি বলতে পারবো কে জানে। তারপরও আমি বলতে চাই। ভেতর থেকে শুনার খুব আগ্রহ না এলেও তুমি শুনো। অনেকদিন আমি লিখি না। আজ আমি তোমার জন্য লিখতে চাই।

 মাওলা! সব কাজের তাওফীক তো তুমিই দাও। তুমি আমায় দাও বলার ভাষা এবং সাথে তোমার কাছে গৃহীত হওয়ার মতো নিষ্ঠা। শব্দের চাকচিক্য যে তোমাকে খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারে না। 

                                         ইন শা আল্লাহ চলবে।

-মুফতি ডা: মসীহুল্লাহ ভাই

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url