সাদা এপ্রোন-২
সাদা এপ্রোন
পার্ট ২
_
লেকচার গ্যালারী থেকে নেমে টিউটোরিয়াল ক্লাসের উদ্দেশ্য বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবের দিকে চলার পথে একজন আমাকে প্রায়ই সালাম দেয়। দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাতটা মেলায়। যাকে প্রথাগত হ্যান্ডশেক বলা চলে না। সালামের শুদ্ধ উচ্চারণের সাথে আন্তরিক মুসাফাহা মনে হালকা বিস্ময় সৃষ্টি করে। এই ব্যক্তি আমার ইয়ারের 'বি' ব্যাচের একজন। গলিতে প্রায়ই দু'তিনবার যাদের সাথে আমাদের ক্রস হয়।
স্যারদের সালাম করা তো হয়েই থাকে। সেই প্রাইমারী লেভেল থেকে তার চর্চা দেখছি। কিন্তু ক্লাসমেটকে সালাম একটা বিরল বিষয়। যে ভাইটি এভাবে সালাম দেয়, তার মুখে দাঁড়ি, মাথায় টুপি, পরণে পানজাবী। তাকে মাদ্রাসা-ছাত্রদের মতো দেখায়। ছেলেরা এই প্রকৃতির বন্ধুদের নামের শেষে হুজুর লাগিয়ে সম্বোধন করে। এই 'হুজুর' সম্বোধনের মাঝে কয় পার্সেন্ট সম্মানবোধ, আর কয় পার্সেন্ট 'তুচ্ছার্থে বলা', তা সঠিকভাবে হিসাব করা মুশকিল। তবে হুজুর হলেই লেভেল যে কিছুটা নীচে মনে করা হয় তা সন্দেহের উর্ধ্বে।
হুজুর মানেই অজ্ঞ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, কালচার সম্পর্কে অসচেতন এমন একটা ধারণা কিভাবে যেন অনেকেরই মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে। এই ধারণা যতটা না জেনে-বুঝে, তার চেয়ে বেশি 'হুজুর না হয়ে 'সাহেব' হওয়াই সুপিরিয়রিটি' - এ ধরনের একটা অহংবোধ থেকে। পানজাবী পড়ুয়া ছেলেটা ক্লাসে স্যারের প্রশ্নের উত্তর একাই দিতে থাকে, কোন কোন ডিপার্টমেন্টের হেড তাকে তালাশ করে সামনে এনে বসান, কার্ড ফাইনাল, ওয়ার্ড ফাইনালগুলোতে সে প্রায়ই ফার্স্ট সেকেন্ড হতে থাকে, টেকস্টবইয়ের বড় বড় চ্যাপ্টার ঘন্টাদুয়েক সময় নিয়ে গিলে ফেলে কিভাবে যেন সব জটিল জায়গা আধাঘন্টায় একটানা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু এরপরও তার পোষাকের দিকে তাকালে যেন মনে হতে থাকে ঠিক কোথায়, কোন এক দিক দিয়ে সে যেন অনবহিত, অজ্ঞ, অসম্পূর্ণ । যে কোন প্রফে ক্লাসের যে দশজন নিশ্চিত পাশ করবে বলে মনে করা হতে থাকে, তাকে চোখ বন্ধ করে তাদের মাঝে গুনতে হয়। কিন্তু এরপরও তার চোখনীচু করে হাঁটা, আড্ডায় সংযত কথা বলা, অবয়বে বিনয়ী-ভাব ধরে রাখা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে মনে হতে থাকে তার এই পোষাকের কারনে কোথায় যেন সে একটু অপরাধী, আমাদের এই স্যুটেট-বুটেট সোসাইটিতে ঠিক কোথায় যেন তার উপস্থিতিটা একটা স্পট বসিয়ে দিয়েছে।
তো বলছিলাম এক সালামদাতার কথা। এই সালাম-মুসাফাহা তো সর্বোচ্চ তিন সেকেন্ডেের ব্যাপার, কিন্তু কেন যেন এই সালামদাতার হাসি হাসি চেহারাটা আমার মাথায় অস্পষ্টভাবে দীর্ঘক্ষণ ঘুরতে থাকে। 'কে সে?' এই হাসি এবং এই মুসাফাহা কেন যেন অব্যক্ত নানা কথা হয়ে আমার মাথায় বাজতে থাকে।
একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম মাদ্রাসায় পড়েছে কিনা। সে আমার ব্যাচের আর দুই হুজুরের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝালো, 'তারাও তো মাদ্রাসায় পড়ে নি'। এসএসসি-এইচএসসি সব কলেজে কাটিয়ে তারা হুজুর কেন, আবার একদম মাদ্রাসা-পড়ুয়া হুজুরের মতোই বা কেন - এই প্রশ্নের উত্তর আমার ক্লিয়ার হতে চায় না। আবার কেনই বা কলেজে পড়লেই হুজুর হতে হয় না - তার পক্ষেও কোন যুক্তি আমি বের করতে পারলাম না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সম্পূর্ণ বুঝে আসতে আমার লাগলো পূর্ণ তিন মাস, যে তিনমাস পর আমিও একদিন 'হুজুর' বেশে ক্যাম্পাসে ঢুকলাম। ঢুকলাম ভয়ে ভয়ে, বন্ধু বা স্যারদের মুখ নিঃসৃত কোন বিশেষ বাণীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে। ক্লাস শুরু হওয়া থেকে টানা চার-পাঁচ মাস একটানা প্রতিদিন শার্টপ্যান্ট পরতে থাকা ছেলেটা হঠাৎ এই বেশে কেন - এই প্রশ্ন এবং এই ধরনের সম্ভাব্য প্রশ্নগুলো কেউ করে বসে কিনা এই আশঙ্কায়। প্রথম তিনদিন আমার কোন প্রকার প্রশ্ন ছাড়াই কাটলো। আমি কিছুটা সহজ অনুভব করলাম। তিনদিন পর একজন কেবল এই প্রশ্ন ছুড়লো, ' এই! হুজুর হয়েছিস?' এই প্রশ্নকর্তার চেহারাতেও আমি 'হুজুর' বলতেই তুচ্ছজ্ঞান করার সেই পুরোনা মানসিকতা ফুটে উঠতে দেখলাম।
আমি স্মার্টনেসে এগিয়ে থাকা শত হুজুরকে শতবার দেখেছি। হুজুরের বয়ান 'হা' করে গিলতে থাকা এলিটদের 'পলক না পড়া' দৃষ্টি দেখেছি। আভিজাত্য নামক পশ্চিমা-আনুগত্যের মেকি দেয়াল সুন্নাহর দৃঢ়তায় গুড়িয়ে যেতে দেখেছি। এর আরও অনেক পরে আমি দেখেছি জ্ঞানের দীপ্তি কিভাবে দ্যুতি ছড়ায়, কুরআন ও সুন্নাহর ইলম কিভাবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট দখল করে জ্ঞানের রাজ্যের। তাই আমি 'হুজুর' নামক জীবের প্রতি মানুষের তুচ্ছতার নজরকে করুণা করতে শিখেছি। ক্লিনিক্যাল মেথডস পড়তে গিয়ে বারবার কানে বাজা " What mind does not know, eye cannot see ' বাক্যটিকে আমি সবর্ত্রই সত্য হতে দেখেছি। আমি দেখেছি অজ্ঞ মানেই তার অজ্ঞতার কারনে জ্ঞানীর শত্রু। এ কেমন যেন তার দোষ নয়, দূর্বলতা।
সাদা এপ্রোন গায়ে জড়ানো হে নতুন, তুমি তোমার এই যাত্রায় পাগড়ী পরা হুজুর যেমন পাবে, হিজাবে ঢাকা হুজুরনীর দেখাও পাবে। তুমি আমার এই কথাগুলো সামনে রেখো। নাহলে হয়তো কোনদিন নিজের কাছেই হবে তোমার লজ্জা। আজ এখানে না হলেও, নিশ্চিত অন্যখানে। মাওলা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে লজ্জিত হওয়ার সমস্ত উপকরণ থেকে রক্ষা করুন।
-মুফতি ডা মসীহুল্লাহ ভাই