সাদা এপ্রোন-৭

 সাদা এপ্রোন পার্ট ৭

_

প্রথম দুটি লেকচার শেষে সাদা এপ্রোন কাঁধে ঝুলিয়ে ক্যান্টিনে নাস্তা করতে ঢুকেছি। এই পিরিয়ডের লেকচারটি আজ হবে না। নতুন ক্যাম্পাসে প্রতিটি বিষয়ই উপভোগ্য। এমনকি অফ পিরিয়ডে ক্যান্টিনে বসার ব্যাপারটিও। আমরা যে টেবিলটি চয়েস করেছি সেখানে আগে থেকেই এক সিনিয়র ভাই আছেন। তিনি আমাদের দু'বছরের সিনিয়র। ভাইয়ের হাতে সিগারেট জ্বলছে। বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে। 

-' কি রে, তোদের এই পিরিয়ডটি নেই?'

- ' আজকের লেকচারটি হচ্ছে না, ভাইয়া!' 

ভাইটি আমার ইয়ারমেটদের পরিচিত। আমি লোকাল, বাসায় থাকি, তাই আমার অপরিচিত। কিন্তু সিনিয়রিটি তো হাবভাবে বুঝা যায়। আমার প্যান্ট টাখনুর উপর ভাঁজ করা। শার্টটা 'ইন' করার পরিবর্তে প্যান্টের উপর ছেড়ে দেয়া। নতুন 'তিনদিন' আমার মাঝে সবে এডটুকু পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু পরিবর্তনের এই সংক্ষিপ্ততা ক্যাম্পাসের দাঈদের সাথে আমার সাদৃশ্য পুরো ফুটিয়ে তুলে না। আবার "আমাদের নিজেদের লোক' মনে করার আবহও সৃষ্টি করে না। অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত কাউকে গ্রহন করে না নেয়ার প্রচেষ্টা ভাইয়ের দৃষ্টির অসহিষ্ণুতা থেকেই বুঝা যায়। এই দৃষ্টি আসলেই আপন করে না , বরং ঠেলে দেয় দূরে। নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়, ' তুমি ভিনগ্রহের কেউ'। আমি দৃষ্টির ভাষা বুঝে নিলাম। অপরিচিত একজনের মতো নিজের নাস্তা নিয়ে মশগুল হলাম। 

আমার ইয়ারমেটেরা সিনিয়রকে খুশী করার সর্বোচ্চ তোষামোদ চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা হালাল করার জন্য এই তোষামোদ এক প্রকার জরুরী। তৈলমর্দনকে সবসময়ই উপকারী মনে করা হয়। এখানেও তা নিঃসন্দেহে ফলপ্রসু। তবে আত্মমর্যাদায় ফাটল ধরিয়ে গোলামীর লাগাম গলায় পরা সবার কাছে সহনীয় নয়।

-' এই! সিগারেটটা নে!'

- ' ভাইয়া! আমি সিগারেট খাই না। ' 

-' আবার সিগারেট খাস না! সিগারেট ছাড়া কি আড্ডা জমে রে!' 

আমার বন্ধুর ইততস্ত ভাব সিনিয়রকে খুশি করে না। কি ভেবে বন্ধু সিগারেটটা হাত বাড়িয়ে নেয়। অন্যের মুখের বাসি সিগারেট অনিচ্ছায় মুখে পুরে। সিনিয়রের হাতে ততক্ষণে নতুন আরেকটা। এভাবেই আমার বন্ধুরা সিগারেটে অভ্যস্ত হয়। অবশেষে এমন দিনও আসে, 'বস' সিনিয়রের বাসি সিগারেট তাদের কাছে অমৃত মনে হতে থাকে। কিংবা তা আরও একটু অগ্রসর হয়ে পানির বোতলের ভাগ পর্যন্ত পৌঁছে। 'ভালো' থাকার ইচ্ছেটুকু এভাবেই দূর্বল থেকে দূর্বলতর হতে থাকে। অবশেষে একদিন নেশার গভীরতায় হোস্টেলের জানালার কাচ ভাঙ্গার শব্দ শুনা যায়। কারও কাছেই তখন এই 'সীন' অনভিপ্রেত মনে হয় না। 

সময় গড়িয়ে যায়। রাতজাগা বাড়তে থাকে। ছুটতে থাকে সকালের লেকচার। প্রতি রাতে সে স্বপ্ন দেখে ক্লাস করার, কিন্তু তার এই স্বপ্ন পূরণ হতে চায় না। নতুন নতুন দায়িত্বের ভিড়ে তার আইটেমগুলো পেন্ডিং হতে থাকে। অবশেষে মিষ্টির প্যাকেট হাতে স্যারের বাসায় বিশেষ কায়দায় তার জন্য আইটেম দেয়ার ব্যবস্থা হয়। এই স্পেশাল ব্যবস্থা, কানুনের উর্ধ্বে উঠার এই ব্যতিক্রমী স্বাদ তাকে আহ্লাদিত করে। 

জুনিয়রদের সে তাই জোর গলায় বলতে পারে, "আরে এত পড়া লাগে না!" সিরিয়াস না থেকেও সাপ্লি ছাড়াই ইয়ার অতিক্রমনের এই হিস্টরী জুনিয়রদের সব টেনশন দূর করে দেয়। টেকস্ট উল্টানো না হলেও চটির পৃষ্ঠাগুলো অন্তত তার মুখস্ত থাকে। টেকস্ট পড়ার বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধংদেহী ভাষণ তাই সে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দিতে পারে। আর রাজ্যের শত ব্যস্ততা 'না পড়ার' পেছনে শক্ত অজুহাত হয়ে তাকে সান্ত্বনা দেয়। 

কিন্তু অপ্রাপ্তি ও হারানোর লম্বা খাতা কি তার দিলকে আদৌ সন্তুষ্ট করে? 

প্রিয় ভাইটি! এই অপ্রিয় বাস্তবতাগুলোই হয়তো একদিন হবে তোমারও নিয়তি। কিন্তু তোমার আগাম সচেতনতা, মসজিদের প্রথম কাতারে তোমার আনাগোনা, সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার দূরন্ত সাহস, মানবসেবার আকাশছোঁয়া সম্মানের মুকুট মাথায় ধারণের অদম্য আগ্রহ তোমার জন্য হতে পারে মজবুত ঢাল। সুন্নাহর রঙ হতে পারে তোমার জন্য সুদৃঢ় অহংকার। নিজেকে আগাম বদলানো কারও অনাগ্রহের কারণ হলেও তোমার ক্যারিয়ারের জন্য হতে পারে রক্ষাকবচ। 


-মুফতি ডা. মাসীহুল্লাহ ভাই

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url