সাদা এপ্রোন-৬
সাদা এপ্রোন পার্ট ৬
_
সাদা এপ্রোন গায়ে জড়ানোর সেই শুরুর কথা মনে পড়ে। প্রাপ্তির আনন্দ তখন গভীর ভাবনার দরজাগুলো বন্ধ করে রাখে। সফলতা যিনি দেন তাকে ভুলে গিয়ে নিজেকেই ক্রেডিট দেয়া হয়। ভালোলাগার এই ঘোর আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে গাফেল করে দেয়। প্রাপ্তির এক আনন্দ মাত্রাহীন হয়ে আরও অনেক কিছু হারানোর আশঙ্কা জাগিয়ে তোলে।
নিজের জীবনেও এই প্রাপ্তির সময়টিতে হারাতে বসেছিলাম নিজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এর কারণ ছিলো পুঁজির স্বল্পতা। তুমি হয়তো ভাবছো এ আবার কোন পুঁজির কথা আমি বলছি। এখানে পুঁজির প্রসঙ্গই বা কেন।
যে প্রথম মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছে, অনভিজ্ঞতা যেমন তার চোরাবালিতে পা পড়ে যাওয়ার কারণ হয়, স্বল্প পুঁজি শেষ হওয়ার পর আমিও ঠিক এই ধরনের এক চোরাবালিতে নিজেকে হারাতে বসেছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম আমি ডুবে যাচ্ছি, আমি তলিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তলিয়ে যাওয়া ঠেকানোর শক্তি আমার ছিলো না।
আমি ছিলাম গ্রামের স্কুলের লাজুক ফার্স্টবয়। ক্লাসে আমরা ছেলে মেয়ে ভিন্ন সারিতে বসতাম। এক সাথে কাছাকাছি একটা লম্বাসময় অবস্থানের পরেও কোন মেয়ের সাথে কথা বলার দুঃসাহস আমার হয় নি। এই ধরনের কোন রেওয়াজ আমাদের ওখানে ছিলো না যে!
চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারের ঐ দুই বছরও আমরা যথারীতি সেই ভালো ছেলেই রয়ে গেলাম। কিন্তু চোরাবালিতে আমার প্রথম পা পড়লো ইএলটি ক্লাসে। ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের স্যাররা আমাদের ক্লাস নেন। পারস্পরিক কনভারসেশনের জন্য তাঁরা বিপরীতলিঙ্গের দু'জনকে বেছে নেন। পারস্পরিক কনভারসেশনের এই চোরাবালি ছিনিয়ে নিতে বসেছিলো উনিশ বছরের সেই জমানো লাজুকতা। এর ভয়াবহতা আমি বুঝতে পারছিলাম। বুঝতে পারার মতো স্বল্প পুঁজি তো আমার ছিলো। কেননা ছোটবেলা থেকে আল্লাহওয়ালা ওলামাদের নসীহতপূর্ণ বয়ান আমরা শুনেছি। মহল্লার দ্বীনি পাঠাগারের কিতাবাদি পড়ে হালাল-হারামের ধারণা লাভ করেছি। কিন্তু পরিবেশের প্রতিকূলে হারামকে 'না' বলে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো পুঁজি যে আমার ছিলো না। 'হারাম'কে যেখানে স্মার্টনেস মনে করে বাহবা দেয়া হয়, হারাম থেকে দূরে থাকার প্রচেষ্টারত ব্যক্তিকে যেখানে ব্যাকডেটেড মনে করা হয়, সেখানে আসলেই স্বল্প পুঁজি দিয়ে কিছু করা যায় না।
বিপরীতলিঙ্গের চোখে চোখ রাখা তো দূরের বিষয়, অসতর্কতায় নজর পড়লে যেখানে চোখ নীচু হয়ে যেতো, কোন প্রয়োজনে কথা বলা লাগলে যেখানে কন্ঠ আড়ষ্ট হয়ে পড়তো, সেখানে ক্লাসের সরাসরি কনভারসেশন লাজুকতার দেয়ালকে গুড়িয়ে দিচ্ছিলো, লজ্জারা স্বয়ং লজ্জা পেয়ে বিদায় নিচ্ছিলো অতিদ্রুত। হৃদয়ের নূরগুলো সব ফিকে হয়ে সেখানে অন্ধকারের কালি পড়ছিলো। সযতনে লালন করা পবিত্রতার পরশ কেমন যেন নাজাসাতে ভরে যাচ্ছিলো।
লজ্জা যত কমতে থাকে, তত দূর্বল হতে থাকে ঈমান। পাল্লা দিয়ে কমতে থাকে আমাল। নেকীর নদীতে ভাটা আসে, গুনাহর খালটি প্রশস্ত হয়ে প্রবল হতে থাকে স্রোত। জামাত ছুটে যাওয়া শুরু হয়, এক সময় ঘুম ভাঙ্গতেই সূর্যের দেখা মেলে। গুনাহরা তখন আর অপরিচিত থাকে না, একসময় গুনাহর সাথে হতে থাকে নিত্য বসবাস।
আমার জীবনে চোরাবালিতে এভাবে ডুবে যাওয়ার সময়টির স্থায়িত্ব ছিলো দু'মাস। এই দু'মাস শেষে অটো-ভ্যাকেশানে আমি যখন গ্রামে ফিরেছি, তখন আমি বদলে যাওয়া নতুন মানুষ। আমার সৌভাগ্য আমার মাদ্রাসাপড়ুয়া বন্ধু ছিলো। আমার বদলে যাওয়া অনেককে খুশি করেছে, কিন্তু খুশি হতে পারে নি তারা। আমার প্রতিটি গাফলত তাদের পেরেশান করেছে। আমার হৃদয়ে জমা নতুন অন্ধকার তারা দূর করার ফিকর করেছে। আমার ব্যাধির ট্রিটমেন্টের জন্য তারা খুঁজে ফিরেছে চিকিৎসক। অনেকটা জোর করে তারা আমাকে নিয়ে গেছে তাদের হাসপাতালে। বৃদ্ধ রুহানী চিকিৎসক গভীর দৃষ্টিতে আমার চোখে চোখ রেখেছেন। নির্ভুল ডায়াগনোসিস শেষে তিনি আমাকে ঐশী ঔষধ প্রেসক্রাইব করেছেন। হজরত সোলতান আহমাদ নানুপুরী রহঃ এর সেই তীক্ষ্ণ চাহনি আমার অন্তরে জাগিয়েছে তাওবার সংকল্প। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও সাথে মাসনূন যিকরের ছোট্ট ওয়াজিফা ধীরে ধীরে আমার জন্য হয়েছে রূহানী গোসল। অটো-ভ্যাকেশান শেষে আমি যখন আবার ক্যাম্পাসে তখন আমার সামান্য হলেও অর্জিত হয়েছে নিজেকে ধরে রাখার সামর্থ্য। মনের ভেতর থেকে জেগে উঠা অবৈধ অভিলাসকে শক্ত করে 'না' বলে দেয়ার সাহস। এরপর একদিন বেডিং কাঁধে আমি বের হয়ে গেছি রবের রাস্তায়। সেই আলোচনাটা না হয় আরও পরে হোক।
আমার সেই চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার কারণ ছিলো আমার পুঁজির স্বল্পতা। না হলে নতুন এই পরিস্থিতিতে নিজেকে ধরে রাখতে দেখলাম আমার কিছু সতীর্থকে। নীচুদৃষ্টি, হাসিমুখ, সালাম-মুসাফাহা, প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াত নিয়ে ঠিকই তারা তাদের লক্ষ্যে অটল ছিলো। আমি তাদের দৃঢ়তা দেখলাম। আরও গভীরভাবে অনুভব করলাম নিজের দৈন্য। আমিও একদিন তাদের পিছে পিছে চলা শুরু করলাম।
সাদা এপ্রোন গায়ে জড়ানোর স্বপ্নে বিভোর আমার ভাইটি! তোমার দ্বীনি পুঁজির সামান্য পোঁটলাটিকে তুমি যথেষ্ট ভেবেছো? এসএসসির পর দেয়া চিল্লাটিকে তুমি এনাফ মনে করেছো? অনলাইন শায়খের লেকচার-বেইস্ড ঈমানী জোশকে তুমি রক্ষাকবচ ভেবেছো? অথচ আমার আর তোমার সময়ের মাঝে বড় ব্যবধান। আমার জন্য যা ঝুঁকি ছিলো, এখন তোমার জন্য তা বেড়ে হাজার গুন। সচেতন মাদ্রাসাপড়ুয়া সেই বন্ধুগুলোও এখন যে বড়ই অপ্রতুল।
এই তো সেদিনও সদ্য ভর্তি হওয়া আদরের এক ছোটভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিলো। এরি মধ্যে তার সিনিয়রগন আমার কাছে তার ব্যাপারে ফোন করেছে।।তার হাতে এখন পাক্কা দু'মাস সময়। সিনিয়রগন বুঝেন এই দু'মাস যে কত বড় গনীমত। পুঁজি সংগ্রহের জন্য এর চেযে বড় সুযোগ সামনে খুব মিলবে না। ভাইটি সম্ভবত এসএসসির পরও চিল্লা দিয়েছে। তার কথা হলো চিল্লা তো সে একবার দিয়েছে, এরপর সামনে একবারে চারমাস দেবে। এখন সে সময় দেবে না। আমি তো সহজে বুঝছিলাম এতো এসএসসির গতানুগতিক চিল্লা। সেই চিল্লার সামান্য যা অর্জন তা দিয়ে কি সে অনাগত ফিতনার প্লাবনকে ঠেকাতে পারবে? আল্লাহপাক তাকে তাওফীক দিন। কিন্তু অভিজ্ঞতা জানিয়ে দেয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের আগে এখনই পুঁজি সংগ্রহের জন্য তার হাইটাইম। ইস! আমি যদি তাকে আমার দিলের গহীন থেকে কথাটা বুঝাতে পারতাম! ফিতনার আগুনের উত্তাপ সে কি ঠিক আঁচ করতে পারছে! পারা তো আসলেই কঠিন। যার মুখোমুখি সে এখনও হয় নি, আগাম তা সে কিভাবে বুঝবে?
ক্যাম্পাসে প্রবেশের আগে এই পুঁজি সংগ্রহে সময় দেয়া ছেলেগুলোকে আমি দেখেছি। আমি দেখেছি তারা কত বেশি দৃঢ় ঐ সব ছেলেদের তুলনায়, যারা একদম বিনা প্রস্তুতিতে প্রবেশ করেছে। কত হাফেজে কুরআনকেও দেখলাম ফিতনার জোয়ারে ভেসে গেছে। আলিম পর্যন্ত পড়াশুনার পরও সে সইতে পারে নি স্রোতের চাপ।
তোমার জন্য কত আকুতি তোমার কল্যানকামী সিনিয়রদের বুকে! তুমি যদি তাদের ফিকরের উত্তাপটুকু অনুভব করতে পারতে!
-মুফতি ডা. মাসীহুল্লাহ ভাই