তাওবা
আল্লাহ পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর কতককে কতকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছেন। মর্যাদাপ্রাপ্ত অনন্য একটি সৃষ্টি হচ্ছে বনী আদম তথা মানুষ।
পবিত্র কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে,
‘বাস্তবিকপক্ষে আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত-৭০)
একদিকে মানুষকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করা হয়েছে। অন্যদিকে তাদের মাঝে রয়েছে মানবীয় দুর্বলতা। মানুষের মাঝে যেমন ভালো কাজ করার আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় তেমনি মন্দ কাজের প্রতিও তাদের প্রবণতা লক্ষণীয়। একই সাথে দ্বিমুখী দুটো বস্তু নিজের মাঝে ধারণ করে মানুষ চলতে থাকে আমৃত্যু। মন্দ কাজের প্রতি দুর্বলতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।
ইরশাদ হয়েছে,
‘মানুষকে দুর্বলরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত-২৮)
মানবীয় দুর্বলতার শিকার হয়েই মূলত আমরা দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। আর ঠিক তখনই মানবজাতির চিরশত্রু শয়তান আমাদেরকে গোনাহের প্রতি প্ররোচনা দিতে থাকে। নফস উপর্যুপরি আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করতে থাকে। শয়তান ও নফসের এ সাঁড়াশি যৌথ আক্রমণে আমরা দুর্বল মানুষেরা পরাভূত হয়ে যাই। এক সময় স্রষ্টার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়ি।(নাউযুবিল্লাহ) শয়তান মানুষকে কখনো দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে গোনাহে লিপ্ত করে। আবার কখনো সরাসরি অশ্লীলতা বেহায়াপনার দিকে আহ্বান করে। পক্ষান্তরে দয়াময় আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা ও আপন দয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আদরের সৃষ্টি দুর্বল মানুষের প্রতি তিনি মাগফিরাত তথা ক্ষমার হাতকে সমপ্রসারিত করে রাখেন তাদের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত।
ইরশাদ হয়েছে,
‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে অশ্লীলতার আদেশ করে আর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত-২৬৮)
দুর্বল মানুষ গোনাহে লিপ্ত হয়ে সফলতার পথ থেকে ছিটকে যায়। অজানা অন্ধকার উপত্যকায় উদাসীন হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। দয়াময় আল্লাহ আবারও সেই উদাসীন পথহারা মানুষকে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ দেন। গোনাহ থেকে মুক্ত হয়ে সফলতার পথে পা বাড়ানোর দিকনির্দেশনা দেন। গোনাহের অন্ধকারাচ্ছন্ন উপত্যকা ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যপূর্ণ আলোকময় পথে যাত্রার নামই হচ্ছে তাওবা। যার শাব্দিক অর্থ ফিরে আসা। আঁধার থেকে আলোর দিকে অভিযাত্রা। তাওবার মাধ্যমে একজন মানুষ ব্যর্থতার অতল গহ্বর থেকে সফলতার রৌদ্রোজ্জ্বল রাজপথে উঠে আসে। এ কারণেই কোরআন মাজিদে তাওবাকে সফলতার উপায় বলে অভিহিত করা হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে,
‘হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পার।’ (সুরা নূর, আয়াত-৩১)
পরিচয়
তওবা (আরবি: توبة) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অনুশোচনা করা, মহান আল্লাহতালার কাছে ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা, কোরআন এবং হাদীসে শব্দটি আল্লাহর নিষেধকৃত বিষয়সমূহ ত্যাগ করা ও তার আদেশকৃত বিষয়সমূহর দিকে ফিরে আসা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইস্তেগফার শব্দের অর্থ হল- ক্ষমা প্রার্থনা করা।
শব্দ দুটির অর্থ খুবই কাছাকাছি।
তওবা ও ইস্তেগফারের মধ্যে পার্থক্যঃ-
ব্যাপক অর্থে তওবা বলা হয়: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের অন্যায় বা পাপরাশি থেকে নিজেকে মুক্ত করা। অন্যায়ের প্রতি অনুশোচনা করত: দৃঢ়তার সাথে বর্জন করার অঙ্গিকার গ্রহণ করা। এবং ভবিষ্যতে অন্যায়ে ফিরে না যাওয়ার মনমানসিকতা পোষণ করা।
ইস্তেগফার বলা হয়; কখনো তওবার অর্থেও হতে পারে। আবার কখনো শুধুমাত্র ক্ষমা প্রার্থনার শব্দগুলো উচ্চারণ করাকেও ইস্তেগফার বলা হয়। যেমন; আস্তাগফিরুল্লাহ (হে আল্লাহ! আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি)। আল্লাহুম মাগফির লি (হে আল্লাহ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।)
তওবা-ইস্তেগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যা নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। শরীয়তে তওবা-ইস্তেগফারের গুরুত্বও অনেক।
তাওবার কবুলের শর্ত
ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শরফ আন নববী (রহ.) (জন্ম-৬৩১ হি. মৃত্যু-৬৭৬ হিজরি) বলেন, উলামায়ে কেরাম বলেছেন, আল্লাহতায়ালার দরবারে তাওবা কবুল হওয়ার শর্ত তিনটি।
‘এক. গোনাহ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা।দুই. গোনাহের কারণে লজ্জিত হওয়া।তিন. ভবিষ্যতে গোনাহ না করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করা।’
গোনাহের সম্পর্ক যদি কোনো ব্যক্তির সাথে হয়ে থাকে যেমন, কাউকে কষ্ট দিল, অন্যায়ভাবে কারো সম্পত্তি আত্মসাৎ করে নিল, তাহলে এ ক্ষেত্রে উপরিউক্ত তিনটি শর্তের পাশাপাশি আরো একটি শর্ত পূরণ করতে হবে। তা হচ্ছে, যাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আত্মসাৎকৃত ধনসম্পত্তি তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। (রিয়াযুস সালিহীন, পৃষ্ঠা ১৪, দারুল হাদিস কায়রো মিসরের সংস্করণ)
তাওবার গুরুত্ব
আল্লাহর আদেশ
তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থী হও, নিশ্চয় মহান আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু’ (সূরা বাকরাহ:১৯৯)
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ‘যারা কোন পাপ কাজ করে ফেললে কিংবা নিজেদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ ব্যতীত গুনাহসমূহের ক্ষমাকারী কেই বা আছে’ (সূরা আলে ইমরান:১৩৫)
أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ“তবে কি তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে না ও তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ (مسلم)
“হে মানবমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর, আর আমি দৈনন্দিন একশত বার তাঁর নিকট তাওবা করি” (সহীহ মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা খুশী হোন
রাসূলু¬ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ) (مسلم)“আল্লাহ তাঁর মু’মিন বান্দার তাওবার কারণে অধিকতর আনন্দিত হন” (সহীহ মুসলিম)
একজন মানুষ যখন গোনাহের অন্ধকার থেকে তাওবার আলোকময় রাজপথে পদচারণা শুরু করে তখন আল্লাহতায়ালা ভীষণ আনন্দিত হন। কতটুকু আনন্দিত হন তার খানিকটা বিবরণ হাদিস শরিফে পাওয়া যায়।
রাসূলু¬ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ أَحَدِكُمْ مِنْ أَحَدِكُمْ بِضَالَّتِهِ إِذَا وَجَدَهَ“তোমাদের কেউ তার হারানো মাল পুনঃপ্রাপ্তিতে যতটা আনন্দিত হয়, তোমাদের কারো তাওবায় (ক্ষমা প্রার্থনায়) আল্লাহ তার চেয়ে অধিক আনন্দিত হয়।"
হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একজন মানুষ যখন তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে তখন আল্লাহ ওই ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হন, বিজন মরুভূমিতে খাবার পানীয়সহ যার বাহন হারিয়ে যায়। আর ওই ব্যক্তি নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকে। অতঃপর কোনো একটি গাছের নিচে এসে হতাশ লোকটি ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে জেগে লোকটি দেখে তার বাহন তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি আনন্দের আতিশয্যে ভাষা হারিয়ে প্রলাপ বকতে বকতে বলে, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার গোলাম। আমি তোমার প্রভু।’ খুশির আধিক্যে তার ভাষা এলোমেলো হয়ে যায়। একজন বান্দার তাওবায় আল্লাহ ওই ব্যক্তির চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি আনন্দিত হন। (সহিহ বুখারি : ১১/৬৩০৯, সহিহ মুসলিম : ৪/২১০৫)
আল্লাহ তাআলা তওবা- ইস্তেগফারকারীকে ভালবাসেন
মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ“মহান আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা আল বাকারা: ২২২)
তাওবার সময়
রাতদিন সব সময় আল্লাহ তার বান্দার জন্যে ক্ষমার হাতকে সমপ্রসারিত করে রাখেন। প্রভুর মাগফিরাত মানুষকে প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকে।
হজরত আবু মুসা আব্দুল্লাহ ইবনে কায়েস আশয়ারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা রাতের বেলায় নিজের ক্ষমার হাতকে সমপ্রসারিত করে রাখেন, যাতে দিনের বেলায় যারা গোনাহ করে ফেলেছে তারা যেন তাওবা করে নিতে পারে। এমনিভাবে দিনের বেলায়ও তিনি আপন মাগফিরাতের হাতকে বিস্তৃত করে রাখেন, যাতে রাতের গোনাহগাররা তাওবা করে তার দিকে ফিরে আসে। এই সুযোগ পশ্চিম দিকে সূর্যোদয় তথা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম: ৪/২১১৩, মুসনাদে আহমদ: ৪/৩৯৫)
একজন মানুষের মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকে।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহতায়ালা তার বান্দার তাওবা কবুল করে থাকেন, যতক্ষণ না ওই বান্দার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। (জামে তিরমিযি : ৫/৩৫৩৭, ইমাম তিরমিযি [রহ.] হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।)
তাই আসুন আমরা হূদয়ের জানালা খুলে দিই। দয়াময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিই। গোনাহের নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত ভূখণ্ড থেকে তাওবার পবিত্র সুগন্ধময় রৌদ্দোজ্জ্বল প্রান্তরে যাত্রা করি। আঁধার থেকে আলোর দিকে ফিরে আসি। তাওবার সুরভিত নয়নাভিরাম উদ্যানে আপনাকে স্বাগতম।
তাওবার পদ্ধতি
যে তওবার পর পাপকর্মের পুনরাবৃত্তি হয় না, তাকে বলে তওবাতুন নাসুহা বা খাঁটি তওবা।
আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা করো-বিশুদ্ধ তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের প্রভু তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নদীসমূহ বয়ে যায়। -সূরা তাহরীম (৬৬) : ৮
সুতরাং, আমাদের খাঁটি তাওবা করতে হবে।
কোন গুনাহগার ব্যক্তি তওবা করতে চাইলে-
১. তাওবা কবুলের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।
২. তারপর সুন্দরভাবে ওযূ করবে।
ওছমান বিন আফফান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوْءَ خَرَجَتْ خَطَايَاهُ مِنْ جَسَدِهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَظْفَارِهِ-‘যে ব্যক্তি ভালভাবে ও সুন্দর করে ওযূ করে তার শরীর থেকে সমস্ত গুনাহ বের হয়ে যায়, এমনকি তার নখের নীচ থেকেও বের হয়ে যায়’।
আবু হুরাইরা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন,
‘যখন কোন মুসলমান বা মুমিন বান্দা ওযূ করে এবং তার মুখমন্ডল ধুয়ে ফেলে তখন পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুটির সাথে তার চেহারা থেকে ঐ সমস্ত গুনাহ বের হয়ে যায় যেগুলোর দিকে তার চোখ দু’টির সাহায্যে দৃষ্টিপাত করেছিল। অতঃপর যখন সে তার হাত দু’টি ধুয়ে ফেলে, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুটির সাথে তার হাত দু’টি থেকে ঐ সমস্ত গুনাহ বের হয়ে যায়, যা তার হাত দু’টির মাধ্যমে হয়েছিল। এরপর যখন সে তার পা দু’টি ধুয়ে ফেলে, তখন সে পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুটির সাথে ঐ সমস্ত গুনাহ বের হয়ে যায়, যার দিকে তার পা দু’টি এগিয়ে গিয়েছিল, এমনকি সে গুনাহ থেকে সস্পূর্ণ পূত-পবিত্র হয়ে যায়’।
৩. ওযূর শেষে নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে-
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ. اَللَّهُمَّ اجْعَلْنِيْ مِنَ الَتَّوَّابِيْنَ، وَاجْعَلْنِيْ مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ
উচ্চারণ: আশহাদু আন্-লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। আল্লা-হুম্মাজ‘আলনী মিনাত তাউয়াবীনা ওয়াজ‘আলনী মিনাল মুতাত্বাহহিরীন’।
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারীদের অর্ন্তভুক্ত করুন এবং পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করুন’।
ওমর ফারূক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে যে রাসূল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
‘যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে ওযূ করবে ও কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হবে। যেটা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে’।
৪. তারপর দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে।
রাসূল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَا مِنْ عَبْدٍ يُذْنِبُ ذَنْباً فَيُحْسِنُ الطُّهُوْرَ، ثُمَّ يَقُوْمُ فَيُصَلِّيْ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللهَ إِلاَّ غُفِرَ لَهُ‘যদি কোন বান্দা গুনাহ করে অতঃপর সুন্দরভাবে পবিত্রতা অর্জন করে, অতঃপর দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন’।
৫. এখন ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
তওবার জন্য নিম্নের দো‘আটি বিশেষভাবে সিজদায় ও শেষ বৈঠকে পড়া যায়।
اَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِىْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّوْمُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ-উচ্চারণ: ‘আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূম ওয়া আতূবু ইলাইহে’। অর্থঃ আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি সেই আল্লাহর নিকটে যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক এবং তাঁর দিকেই আমি ফিরে যাচ্ছি বা তওবা করছি’।
এছাড়া সাইয়িদুল ইসতেগফার পড়বে। সাইয়িদুল ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দো’আটি হ’ল,
اَللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّىْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِىْ وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَي عَهْدِكَ وَ وَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَّى وَأَبُوْءُ بِذَنْبِىْ فَاغْفِرْلِىْ، فَإِنَّهُ لاَيَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلاَّ أَنْتَ-উচ্চারণ: আল্লা-হুমা আনতা রাববী লা ইলা-হা ইল্লা আনতা খালাক্বতানী, ওয়া আনা ‘আবদুকা ওয়া আনা ‘আলা ‘আহদিকা ওয়া ওয়া‘দিকা মাস্তাত্বা‘তু। আ‘ঊযুবিকা মিন শার্রি মা ছানা‘তু। আবূউ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবূউ বিযাম্বী, ফাগফিরলী ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা’।অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রভু। তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ এবং আমি তোমার দাস। আমি আমার নিকটে কৃত অঙ্গীকার ও ওয়াদার উপরে সাধ্যমত কায়েম আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার নিকট পানাহ চাচ্ছি। আমার উপরে তোমার অনুগ্রহ স্বীকার করছি এবং আমি আমার গুনাহ স্বীকার করছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কেননা তুমি ব্যতীত পাপ ক্ষমা করার কেউ নেই’।
রাসূল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এই দো‘আ পাঠ করবে, দিবসে পাঠ করে রাতে মারা গেল কিংবা রাতে পাঠ করে দিবসে মারা গেল, সে জান্নাতী হবে’।
ক্ষমা প্রার্থনার পর বেশী বেশী যিকির এবং সাধ্যানুযায়ী বেশী নেক আমল করবে।
আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّـيِّئَاتِ‘নিশ্চয় ভাল কাজগুলি খারাপ কাজগুলিকে মিটিয়ে দেয়’ (হূদ ১১/১১৪)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
এক ব্যক্তি একটি মেয়েকে চুমো খেয়েছিল। তারপর সে নবী করীম (ছাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে তাকে একথা জানিয়েছিল। ফলে আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করলেন, وَأَقِمِ الصَّلاَةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفاً مِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّـيِّئَاتِ- ‘ছালাত কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তভাগে আর রাতের কিছু সময়ে। নিশ্চয়ই ভাল কাজগুলি খারাপ কাজগুলিকে মিটিয়ে দেয়’ (হূদ ১১/১১৪)। লোকটি জিজ্ঞেস করল, এ বিধান কি আমার জন্যও? রাসূল (ছাঃ) জবাবে বললেন, আমার সমস্ত উম্মতের জন্য’।
অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
اِتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَاتَّبِعِ السَّيَّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ‘তুমি যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর এবং অসৎ কাজ করলে তারপর সৎকাজ কর। তাহ’লে ভাল কাজ মন্দকাজকে শেষ করে দিবে। আর মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার কর।'
তওবা ও ইস্তিগফারের কতিপয় দো‘আ
ইসতিগফারের জন্য সবচে’ উত্তম হল কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত ইসতিগফার বিষয়ক দুআগুলো বুঝে বুঝে মুখস্থ করবে। সেই দুআগুলোর মাধ্যমে রাব্বে কারীমের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তবে নিজের ভাষায় নিজের মতো করে ইসতিগফার করলেও ঠিক আছে। কারণ আল্লাহ সকল ভাষা, সবার কথা বুঝেন। সকলের আরজি কবুল করেন।
ইসতিগফারের ১৮ টি দুআ এখানে উল্লেখ করা হল-
رَبَّنَا ظَلَمْنَاۤ اَنْفُسَنَا، وَ اِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَ تَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন ও আমাদের প্রতি রহম না করেন তাহলে অবশ্যই আমরা অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। -সূরা আরাফ (৭) : ২৩
وَ اِلَّا تَغْفِرْ لِیْ وَ تَرْحَمْنِیْۤ اَكُنْ مِّنَ الْخٰسِرِیْنَ
(হে আমার প্রতিপালক!) আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন ও আমার প্রতি দয়া না করেন তাহলে আমিও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। -সূরা হুদ (১১) : ৪৭
رَبِّ اِنِّیْ ظَلَمْتُ نَفْسِیْ فَاغْفِرْ لِیْ
হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। -সূরা কাসাস (২৮) : ১৬
لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ ، اِنِّیْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِیْنَ
হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি সকল ত্রæটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী। -সূরা আম্বিয়া (২১) : ৮৭
হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা মাতা ও সকল ঈমানদারকে ক্ষমা করুন। -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৪১
رَبِّ اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِمَنْ دَخَلَ بَیْتِیَ مُؤْمِنًا وَّ لِلْمُؤْمِنِیْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ
হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার পিতা-মাতাকেও এবং প্রত্যেক এমন ব্যক্তিকেও, যে মুমিন অবস্থায় আমার ঘরে প্রবেশ করেছে আর সমস্ত মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকেও। -সূরা নূহ (৭১) : ২৮
رَبِّ اغْفِرْ وَ ارْحَمْ وَ اَنْتَ خَیْرُ الرّٰحِمِیْنَ
হে আমার প্রতিপালক! আমার ত্রæটিসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। আপনি তো দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১১৮
رَبَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَ ارْحَمْنَا وَ اَنْتَ خَیْرُ الرّٰحِمِیْنَ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনি দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১০৯
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ كَفِّرْ عَنَّا سَیِّاٰتِنَا وَ تَوَفَّنَا مَعَ الْاَبْرَارِ، رَبَّنَا وَ اٰتِنَا مَا وَعَدْتَّنَا عَلٰی رُسُلِكَ وَ لَا تُخْزِنَا یَوْمَ الْقِیٰمَةِ ، اِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِیْعَادَ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের মন্দসমূহ মিটিয়ে দিন এবং আমাদেরকে পুণ্যবানদের মধ্যে শামিল করে নিজের কাছে তুলে নিন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে সেই সবকিছু দান করুন, যার প্রতিশ্রæতি আপনি নিজ রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে দিয়েছেন। আমাদেরকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি কখনও প্রতিশ্রæতির বিপরীত করেন না। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৯৩-১৯৪
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَاۤ اِنْ نَّسِیْنَاۤ اَوْ اَخْطَاْنَا، رَبَّنَا وَ لَا تَحْمِلْ عَلَیْنَاۤ اِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهٗ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِنَا، رَبَّنَا وَ لَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهٖ، وَ اعْفُ عَنَّا، وَ اغْفِرْ لَنَا، وَ ارْحَمْنَا، اَنْتَ مَوْلٰىنَا فَانْصُرْنَا عَلَی الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ.
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনো ভুল-ত্রæটি হয়ে যায়, সেজন্য আমাদের পাকড়াও করবেন না।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করবেন না, যেমন অর্পণ করেছিলেন আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন ভার চাপিয়ে দিবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।
আপনি আমাদের ত্রæটিসমূহ মার্জনা করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। -সূরা বাকারা (২) : ২৮৬
رَبَّنَاۤ اِنَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ قِنَا عَذَابَ النَّارِ
হে আমাদের রব! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ اِسْرَافَنَا فِیْۤ اَمْرِنَا، وَ ثَبِّتْ اَقْدَامَنَا وَ انْصُرْنَا عَلَی الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ
হে আমাদের রব! আমাদের গোনাহসমূহ এবং আমাদের দ্বারা আমাদের কার্যাবলিতে যে সীমালঙ্ঘন ঘটে গেছে তা ক্ষমা করে দিন। আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে বিজয় দান করুন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৪৭
اللهُمّ أَنْتَ الْمَلِكُ، لَا إِلهَ إِلّا أَنْتَ، أَنْتَ رَبِّي، وَأَنَا عَبْدُكَ، ظَلَمْتُ نَفْسِي، وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي جَمِيعًا، إِنّهُ لَا يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ
হে আল্লাহ! আপনিই মালিক। আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি আমার প্রতিপালক। আমি আপনার বান্দা। আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি। আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি। সুতরাং আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া পাপ ক্ষমাকারী কেউ নেই। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৭১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৭৬০
اللّهُمّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِيْ إِنّكَ أَنْتَ الغَفُورُ الرّحِيمُ
হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি। আপনি ছাড়া আমার পাপরাশি ক্ষমা করার কেউ নেই। আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূর্ণ মাগফিরাত নসীব করুন। আর আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, চিরদয়াময়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৩৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৫
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الّذِي لَا إِلهَ إِلّا هُوَ الْحَيّ الْقَيّوم، وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
আমি ওই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। যিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক। আমি তার কাছে তাওবা করছি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৭, জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৮৯৪
رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيّ، إِنّكَ أَنْتَ التّوّابُ الرّحِيمُ
হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তাওবা কবুলকারী, চিরদয়াময়। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৭২৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৬
اللّهُمّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلهَ إِلّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنّهُ لاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ
হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার ও আপনার প্রতিশ্রæতির উপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। আমার প্রতি আপনার নিআমতের কথা স্বীকার করছি। আপনার কাছে আমি আমার গোনাহের কথা স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া কেউ গোনাহ ক্ষমা করতে পারে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬
আমি আমার প্রতিপালক আল্লাহর কাছে সকল গোনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছে তাওবা করছি। সুমহান আল্লাহ ছাড়া আমাদের কোনো সাধ্য নেই, শক্তি নেই। [আল্লাহর কোনো বুযুর্গ বান্দার শেখানো ইসতিগফারের বাক্য। যার অর্থ ঠিক আছে।]
মনে রাখতে হবে, ইসতিগফারের প্রাণ হল তাওবা। আর তাওবার হাকীকত হল, মানুষ আল্লাহ তাআলার নাফরমানী ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে। পিছনের অন্যায়গুলোর কাফফারা আদায় করবে। যেখানে যে কাফফারার কথা বলা হয়েছে সেখানে তা-ই আদায় করবে। বিশেষ করে মানুষের কোনো হক নষ্ট হয়ে থাকলে সেগুলো আদায়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবে।
একথাও মনে রাখবে, ইসতিগফারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সুরত হল, কুরআনে কারীমে কিংবা হাদীস শরীফে যে আমল ও ইবাদাতের প্রসঙ্গে মাগফিরাতের ওয়াদা করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিবে।
প্রত্যেক মুমিনের যেহেনেই সেই আমলগুলোর একটা তালিকা থাকা উচিত। এই তালিকায় সর্বপ্রথম রয়েছে ফরয নামায ও অন্যান্য ফরয ইবাদাত। এরপর মাগফিরাত পাওয়ার আমলগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা। তাছাড়া দান-সদকা, যিকির-আযকার ও অন্যান্য নফল ইবাদতগুলো তো রয়েছেই।
যিকির ও দুআর মধ্যে সবচে বরকতপূর্ণ আমল হল দরূদ শরীফ। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফাআত এবং আল্লাহ তাআলার রহমত ও মাগফিরাত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাওবার ফজিলত
কোন বান্দা যখন খালেছ অন্তরে তওবা করে তখন আল্লাহ তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন
আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَّعْمَلْ سُوْءاً أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللّهَ يَجِدِ اللّهَ غَفُوْراً رَّحِيْماً‘যে গুনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়’ (নিসা ৪/১১০)।
হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,
يَا عِبَادِيْ إِنَّكُمْ تُخْطِئُوْنَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعاً فَاَسْتَغْفِرُوْنِيْ أَغْفِرْ لَكُمْ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা দিবা-নিশি পাপ করে যাচ্ছ আর আমি তোমাদের সকল পাপ মোচন করছি। অতএব তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব’ (মুসলিম)।
রাসূল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
اَلتَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لاَذَنْبَ لَهُ‘তওবাকারী এমন যে, তার কোন গুনাহ নেই’
তওবা খারাপ কাজগুলিকে ভাল কাজে রূপান্তরিত করে
বান্দা যখন তওবা করে তখন আল্লাহ পূর্বের পাপগুলি ক্ষমা করে ভাল কাজে রূপান্তরিত করেন।
আল্লাহ বলেন,
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلاً صَالِحاً فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْراً رَّحِيْماً‘কিন্তু যারা তওবা করে, বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (ফুরক্বান ২৫/৭০)
তওবার দ্বারা অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, মনের কালিমা দূর হয়
পাপ করলে অন্তরে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। যার ফলে হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। আর ইস্তেগফার পাপ ও তার প্রভাবকে দূর করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
‘যখন বান্দা কোন পাপ করে তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। যখন সে তওবা করে ও ক্ষমা চায় তখন তার অন্তরকে পরিস্কার করা হয়। আর যদি পাপ বাড়তেই থাকে তাহ’লে দাগও বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তার অন্তরের উপর ছেয়ে যায়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘না এটা সত্য নয় বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনের উপর মরিচারূপে জমে গেছে’ (মুতাফফিফীন-১৪)।
তওবা ইস্তেগফার দ্বারা বালা-মুছীবত দূর হয়
ইউনুস (আঃ) কে যখন মাছে খেয়ে ফেলল, তখন তিনি আল্লাহর কাছে তওবা ইস্তেগফার করতে লাগলেন। ফলে আল্লাহ তাকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করলেন এবং বললেন,
فَلَوْلاَ أَنَّهُ كَانَ مِنْ الْمُسَبِّحِيْنَ- لَلَبِثَ فِيْ بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُوْنَ‘যদি তিনি তাসবীহ পাঠ না করতেন, তবে ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই তিনি অবস্থান করতেন’ (ছাফফাত ৩৭/১৪৩-১৪৪)
তওবার দ্বারা আল্লাহর ভালবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়
আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِيْنَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِيْنَ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ (বাকারাহ ২/২২)
তওবা দুনিয়ায় প্রশান্তিময় জীবন দান করে
আল্লাহ বলেন,
وَأَنِ اسْتَغْفِرُواْ رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُواْ إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَّتَاعاً حَسَناً إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِيْ فَضْلٍ فَضْلَهُ‘আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহ’লে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী দিবেন’ (হূদ ১১/৩)
তওবার মাধ্যমে রিযিক বৃদ্ধি পায়, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত হয়
আল্লাহ বলেন,
اِسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّاراً- يُرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَيْكُمْ مِّدْرَاراً- وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِيْنَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَاراً‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টিধারা ছেড়ে দিবেন। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদী-নালা প্রবাহিত করবেন’ (নূহ ৭১/১০-১২)
তওবা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের চাবিকাঠি
আল্লাহ বলেন,
فَأَمَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحاً فَعَسَى أَنْ يَّكُوْنَ مِنَ الْمُفْلِحِيْنَ‘তবে যে তওবা করে, বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎ কর্ম করে, আশা করা যায় সে সফলকাম হবে’ (ক্বাছাছ ২৮/৬৭)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
إِلاَّ مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحاً فَأُوْلَئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُوْنَ شَيْئاً‘কিন্তুু তারা ব্যতীত যারা তওবা করেছে, বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের উপর কোন যুলুম করা হবে না’ (মারইয়াম ১৯/৬০)
তওবার দ্বারা শারীরিক শক্তি অর্জিত হয়
আল্লাহ হূদ (আঃ) এর বাচনিক বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন,
وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُواْ رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُواْ إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَيْكُمْ مِّدْرَاراً وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلاَ تَتَوَلَّوْاْ مُجْرِمِيْنَ‘আর হে আমার কওম! তোমাদের পালনকর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তারই প্রতি মনোনিবেশ কর। তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, আর তোমরা অপরাধীদের মত বিমুখ হয়ো না’ (হূদ ১১/৫২)।
তওবাকারীদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ
আল্লাহ বলেন,
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلاَةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيّاً، إِلاَّ مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحاً فَأُوْلَئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلاَ يُظْلَمُوْنَ شَيْئاً‘অতঃপর তাদের পরে এল পরবর্তীরা। তারা ছালাত বিনষ্ট করল ও কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হ’ল। অচিরেই তারা ভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তুু তারা ব্যতীত, যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের উপর কোরূপ যুলুম করা হবে না’ (মারইয়াম ১৯/৫৯-৬০)