আমাদের সোনালি অতীত
আজকের স্পেন আমরা শাসন করেছিলাম দীর্ঘ ৮০০ বছর। এই ভারতবর্ষে আমাদের সোনালি ইতিহাস তো সেদিনের গল্প। যার নিদর্শন হিসেবে আজো দাঁড়িয়ে আছে তাজমহল, কুতুব মিনার, ময়ূর সিংহাসন,লাল কেল্লার মতো স্বর্গীয় স্থাপনা। আজকের প্রতাপশালী ফ্রান্স অসংখ্যবার নাকানিচুবানি খেয়েছে মুসলিম রণবীরের হাতে। আমাদের নাঙ্গা তলোয়ারের ভয়ে বারবার কেঁপে উঠতো ইউরোপ আফ্রিকার জালিম শাহীর মসনদ। দুঃখের বিষয় আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ জানেনই না আমাদের সেই সোনালি ইতিহাস।
পাঠক, চলুন ইতিহাসের ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে আসি মর্দে মু-জা-হিদ সালাউদ্দিন আইউয়ুবীর আমল থেকে....
⭐⭐⭐
সময়টা ১১৭৩ সাল।
দুনিয়া থেকে ইসলামের শিকড় উপড়ে ফেলার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে খ্রিস্টানরা। অর্থ -মদ আর রূপসী নারীর ফাঁদে ফেলে মুসলিম শাসকদের ঈমান হরণ করতে শুরু করেছে তারা। ইসলামী সালতানাতের ভিত্তি কেঁপে উঠছে বারবার। খ্রিস্টানদের আকর্ষণীয় ফাঁদে আটকে যাচ্ছে তথাকথিত ইসলামের রাহাবাররা।
কিন্তু একজন মানুষ ব্যতিক্রম:- সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী। স্বজাতীয় গাদ্দার ও ক্রুসেডারদের মোকাবেলায় অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি । সঙ্গী পাচ্ছেন হার না মানা আরেক বীর, ইসলামের সূর্য পুরুষ নুরুদ্দীন জঙ্গী কে।
এমনই একটা সময় খবর এলো খ্রিস্টান বাহিনী এবার ধেয়ে আসছে পঙ্গপালের মতো। আক্রমণ হবে এবার দুই দিক থেকেই ।বড় ধাক্কাটা লাগবে সমুদ্রপথে। কারণ:- সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী মরুর সিংহ। গুটিকয়েক জানবাজ সৈন্য নিয়ে মরুপ্রান্তরের বিশাল শত্রুবাহিনীকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন তিনি। তার সৈন্যদের খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ মালায় যুদ্ধ করবার ।তাছাড়া সুলতানের নৌবহরও খুব বেশি শক্তিশালী নয় ।জাহাজ আছে মাত্র গুটিকয়েক।
⭐⭐⭐
ইস্কান্দারিয়ার সমুদ্র উপকূল।খ্রিস্টান কমান্ডার নির্ভয়ে কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়েই তীরে যুদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর করালেন ।তাকে আগেই বলা হয়েছিল যে মিশরের যুদ্ধজাহাজ এখানে নেই। একে একে কূলে ভিড়লো খ্রিস্টানদের তিন শতাধিক যুদ্ধজাহাজ।
গোয়েন্দা তথ্যঅনুযায়ী ইস্কান্দারিয়ায় মুসলমানদের কোন ফৌজ নেই।নেই কোন প্রতিরোধের আশঙ্কাও। অনায়াসে হস্তগত হবে বিশাল এই শহর। কয়েকটি জাহাজের সৈন্যদের নামিয়ে দেয়া হলো--
তাদের বলা হলো তোমরা কোনো বাধার সম্মুখীন হবে না ।আগাম জয়ের নেশায় খ্রিস্টান বাহিনী ছুটে চলে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো।তাদের প্রথম কাজ শহরে লুটতরাজ করা। এরপর নারীদের নিয়ে আদিম খেলায় উম্মাদ হয়ে ওঠা।
এগিয়ে চলেছে খ্রিস্টান বাহিনী। শহরের খুব কাছে পৌঁছাতেই তারা দেখতে পেলো বিভিন্নস্থানে আগুন জ্বলে উঠেছে। মুহূর্তেই রাতের নিকষ কালো অন্ধকার এর পরিবর্তে অগ্নিশিখায় আলোকিত হয়ে উঠলো পুরো এলাকা। প্রকৃতপক্ষে এগুলো ছিল শুকনো খড়, কাঠ ও কাপড়ের স্তুপ।
যেগুলোতে ঢেলে রাখা হয়েছিল কেরোসিন। সালাহউদ্দিন আইউয়ুবীর চৌকস গোয়েন্দা আলী বিন সুফিয়ানের তৈরি করা ফাঁদে পা দিয়েছে খ্রিস্টান সৈন্যরা। অনলালোয় এক একজন খ্রিস্টান সৈন্যকে দেখে দেখে তীরের নিশানা বানানোই ছিল এর উদ্দেশ্য। হঠাৎ ঘরের ছাদ, উঁচু গাছ, এবং বিভিন্ন স্থাপনা থেকে নেমে আসে তীর বৃষ্টি। এরপর রুদ্ধশ্বাস করা কয়েক মুহূর্ত। সলিল সমাধি ঘটে কয়েক হাজার খ্রিস্টান সৈন্যের।
⭐⭐⭐
মূল যুদ্ধ শুরু হয় সমুদ্রে। খ্রিস্টানদের বিশাল নৌবহরের সামনে ঈমানদীপ্ত কয়েক প্লাটুন আইয়ুবী যোদ্ধা। খ্রিস্টান কাপ্তানেরা পিছনে তাকিয়ে দেখে তাদের একেবারে পিছনের কয়েকটি জাহাজে আগুনের শিখা জ্বলে উঠেছে দাউ দাউ করে । পুড়ে ভস্মীভূত হচ্ছে পেছনের সারির সব জাহাজ।
আসলে এটি ছিল মুসলিম জানবাজ দের এক প্রচন্ড আক্রমণ । খ্রিস্টান বাহিনী অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে সবগুলো জাহাজকে একত্রিত করে রেখেছিলেন ।তারা ধরেই নিয়েছিলেন যে বিজয় তাদের সুনিশ্চিত। কিন্তু তারা বুঝতে পারেননি দিনের বেলায় যেসব জেলে তাদের বলেছিলেন ,ইস্কান্দারিয়ায় মুসলিম ফৌজ নেই। প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই ছিলেন সুলতান আইয়ুবির চৌকস গোয়েন্দা।
সন্ধ্যার পর যখন খ্রিস্টানদের নৌবহর তীরে এসে ভিড়ে, সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর নৌপ্রধান তার লুকিয়ে রাখা জাহাজগুলোকে খ্রিস্টানদের নৌবহরের পিছনে নিয়ে যান। শুরু করেন গেরিলা আক্রমণ ।মুহুর্মুহু অগ্নিগোলায় অগ্নি স্তুপে পরিণত হয় খ্রিস্টানদের পেছনের সারির জাহাজগুলো। উভয়পক্ষের অগ্নিগোলা আর অনলালোয় সমুদ্রের বুকে যেন দিন নেমে এসেছে।
রাতভর চলে যুদ্ধ। সমুদ্রে জ্বলতে থাকে অসংখ্য জাহাজ ।মাত্র কয়েক প্লাটুন মুসলিম সৈন্য ধ্বংস করে দিয়েছে খ্রিস্টানদের বিশাল নৌবহর ।খ্রিস্টানদের একাংশ এখনো লড়ে যাচ্ছে দুর্দান্ত বীরবিক্রমে।হঠাৎই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। জয়ের পাল্লা ভারী হতে থাকে খ্রিস্টান বাহিনীর দিকে ।সুলতান আইয়ুবী রিজার্ভে থাকা জাহাজগুলোকে অভিযানে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। রাতের শেষাংশে নৌবাহিনীর প্রধান একটি নৌকায় করে কূলে ভিড়লেন। তাঁর পোশাক রক্তে রঞ্জিত। ক্ষত-বিক্ষত তার শরীর। আগুনে ঝলসে গেছে হাত-পা। ইমানী জজবায় বলিয়ান নৌ প্রধানের খেয়াল নেই শরীরের প্রতি। অস্থিরচিত্তে বর্ণনা করছিলেন রণাঙ্গনের কথা। সুলতান আইয়ুবি তাকে আশ্বস্ত করলেন, ডাক্তার ডেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। সুলতান লক্ষ করলেন নৌ প্রধানের জখম খুবই মারাত্মক ।এখন আর তিনি বসে থাকতে পারছেন না । তার মাথাটা দুলছে পেন্ডুলামের মতো। সুলতান তাকে বিশ্রাম নিতে বললেন।
⭐⭐⭐
সুলতান আইয়ুবি তার হেডকোয়ার্টারে বসে রণাঙ্গনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। সকালের নির্মল আভায় তিনি দেখতে পেলেন অসংখ্য জাহাজ বন্য হাতির মতো উম্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।আগুনে জ্বলছে অনেক জাহাজ।সমুদ্রের উর্মিমালা লাশগুলোকে ছুড়ে ছুড়ে মারছে সমুদ্র তীরে। মুজাহিদ বাহিনীর কোন জাহাজ তার নজরে পড়লো না। অনেকক্ষণ পর দূর দিগন্তে মুজাহিদদের জাহাজগুলো চোখে পড়ল সুলতানের। জাহাজগুলো এগিয়ে আসছে রণাঙ্গনের দিকে।
"তোমার জাহাজ আসছে" বলেই সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী পার্শ্বে দৃষ্টিপাত করলেন। কিন্তু , নৌবাহিনী প্রধান সেখানে নেই !!
নৌপ্রধান তার জাহাজ বছরের আগমন দেখে সুলতান আইয়ুবি কে কিছু না বলেই নিচে নেমে গেছেন। সুলতান যখন তাকে দেখতে পেলেন ততক্ষণে তিনি একটি নৌকায় উঠে বসেছেন এবং নৌকা চলতে শুরু করেছে। সুলতান চিৎকার করে তাকে ডাক দেন, "তুমি ফিরে আসো সাদী, তোমার জায়গায় আমি আবু ফরিদকে পাঠাচ্ছি"।
নৌপ্রধান উচ্চকণ্ঠে জবাব দিলেন, "এটা আমার যুদ্ধ আমিরে মেশের। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে। নয়তো জান্নাতুল ফেরদৌসের সিঁড়িতে ,আল্লাহ হাফেজ"।
⭐⭐⭐
সুলতানের দূত এসে জানালো মরুপথেও খ্রিস্টানদের সাথে তুমুল লড়াই চলছে। সুলতান সেখানকার জন্য কিছু নির্দেশনা জারি করে সমুদ্রের যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। আক্রমণ- প্রতিআক্রমণে যেন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ কে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে উভয় দল।
শেষবেলায় ক্লান্ত সূর্যের ম্লান আলো সুলতান আইয়ুবি কে যে দৃশ্য প্রদর্শন করলো তা হলো- বীর মুজাহিদদের কাছে খ্রিস্টান নৌবহর পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আর মুজাহিদদের জাহাজগুলো ফিরে আসছে ধীরে -ধীরে।সুলতানের হেড কোয়ার্টারের সামনে একটি নৌকা এসে ভিড়লো।
কার যেন লাশ তার মধ্যে। সুলতান বিচলিত কন্ঠে জানতে চাইলেন " কার লাশ এটি?"
জবাব এলো- "নৌবাহিনী প্রধান সাদী বিন সাদের"। সুলতান দৌড়ে নীচে নেমে এলেন। লাশের উপর থেকে কাপড়টা সরালেন। স্বচক্ষে দেখলেন তার নৌ বাহিনীর প্রধান ঝান্ডাবাহী সাদীর রক্তাক্ত লাশ ।সুলতান তার নৌ প্রধানের হাতে চুমু খেয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন"তুমিই সমুদ্র বিজেতা সাদী, আমি নই"।
সুলতান আইয়ুবি নির্দেশ দিলেন, "দুশমনের সব জাহাজগুলোকে ডুবিয়ে দাও, শহীদদের লাশগুলো সমুদ্র থেকে তুলে আনো। একটি লাশও যেন সমুদ্রে না থাকে। তাদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদায় এখানেই দাফন করো। রোম সাগরের হিমেল হাওয়া চিরদিন তাদের কবরগুলোকে ঠাণ্ডা রাখবে"।
সব শহীদ এর দাফন সম্পন্ন হলো। গভীর রাত।সুলতান আইয়ুবি নৌবাহিনী প্রধান সাদী বিন সাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছলছল নয়নে বিড়বিড় করে বললেন -"ধন্য তুমি, হে খ্রিস্টানদের কোমর ভেঙে দেয়া সাদি। কসম সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, মুসলিম জাহানের মায়েরা যতদিন তোমার মত সাদীকে গর্ভেধারণ করবে, ততদিন স্বজাতির গাদ্দারী এবং ক্রুসেডারদের শত শত আক্রমণ ইসলামের ঝাণ্ডা এক চুলও নামাতে পারবে না।"সুলতানের আবেগি কণ্ঠ গেয়ে ওঠে -
ধন্য হে আরব সিংহ
খোশ আমামা বাদ
সমুদ্রে চির দুর্জয় তুমি
নির্ভীক সিন্দাবাদ......।
Holpen:- মরু সিংহ সালাহউদ্দিন, ঈমানদীপ্ত দাস্তান, ক্রুসেড সিরিজ।
©️Khalid Saifullah Khalid