জিকির এবং দু’আ

জিকির

জিকির আরবী শব্দ। বাংলায় এর অর্থ স্মরণ করা বা স্মরণ করানো। ব্যাপক অর্থে ঈমান ও নেককর্ম সবই জিকির বলে গণ্য। তবে কুরআন ও সুন্নাহে জিকির বলতে সাধারণভাবে মুখের ভাষায় ‘আল্লাহর স্মরণ’ করাকে বুঝানো হয়।

জিকিরের গুরুত্বের কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ সকল অবস্থাতেই আল্লাহর জিকির করতেন। ‘আইশা (রা) বলেন, “রাসুলুল্লাহ ﷺ সকল অবস্থায় জিকির করতেন।” (মুসলিম)

জিকির করার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন –

“তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব।” (আল-কুরআন, ২ঃ ১৫২)

যে ‘আমলটি অধিক পরিমাণে করার আদেশ এসেছে সেটি হচ্ছে আল্লাহর জিকির। বেশি বেশি জিকির করার আদেশ দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন –

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।” (আল-কুরআন, ৩৩ঃ ৪১-৪২)

যারা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে তাঁদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন –

“যেসব পুরুষ ও নারী আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, আল্লাহ তাঁদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান তৈরী করে রেখেছেন।” (আল-কুরআন, ৩৩ঃ ৩৫)

অতএব, যখনই সময় পাওয়া যায় তখন, যেমন, হাঁটাচলা অবস্থায়, বা গাড়িতে বসা অবস্থায়, অথবা শোয়া বা দাঁড়ানো অবস্থায় অনায়াসে জিকির করা যেতে পারে। জিকির করার জন্য ওজুর প্রয়োজন নেই, কোন কষ্ট নেই, কোন পরিশ্রম নেই।

উল্লেখ্য, উচ্চস্বরে সম্মিলিতভাবে জিকির করার শিক্ষা রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবীদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। বরং কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অনুচ্চস্বরে জিকির করার নির্দেশ দিয়েছেনঃ

“তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ কর আর উদাসীনদের দলভুক্ত হয়ো না।” (আল-কুরআন, ৭ঃ ২০৫)

১ নং জিকিরঃ

لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللّٰه , লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ
আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

“সর্বোত্তম জিকির হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বোত্তম দু’আ হচ্ছে ‘আলহামদুলিল্লাহ’।” (তিরমিযী ৫/৪৩১, ইবনে মাজাহ ২/১২৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩/১২৬)

“কিয়ামাতের দিন আমার শাফা’আত লাভকারী সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সে-ই হবে, যে তাঁর অন্তরের পরিপূর্ণ একাগ্রতা দিয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।” (বুখারী ১/৪৯)

“আমি এমন একটি বাক্য জানি, যে বাক্যটি যদি কেউ তাঁর অন্তর থেকে সত্যিকারভাবে বলে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে জাহান্নাম তাঁর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। বাক্যটি হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (মুস্তাদরাক হাকীম ১/১৪৩)

“যার সর্বশেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (মুস্তাদরাক হাকীম ১/৬৭৮)

উল্লেখ্য, যে ব্যক্তি সঠিক আক্বীদা-বিশ্বাসের সাথে যত বেশি ভালো ‘আমলের সাথে নিজের জীবনটাকে যাপন করেন, তাঁর অন্তিম মূহুর্তে ভালো চিন্তা, ভালো ‘আমলের সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। তাই মুমিন ব্যক্তি সবসময় নিজের জিহবাকে এই জিকিরে ব্যস্ত রাখবেন, গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রেখে নিজেকে ভালো ‘আমলে নিয়োজিত রাখবেন। যে ব্যক্তি সর্বদা অন্তরের সকল আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে সবসময় এ বাক্যটি বলবেন, ইন-শা-আল্লাহ এ বাক্য তাঁর জীবনের শেষ বাক্য হবে।

২ নং জিকিরঃ

سُبْحَانَ اللّٰه , সুব’হা-নাল্লা-হ
আল্লাহ সকল ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, পবিত্র

৩ নং জিকিরঃ

اَلْحَمْدُ لِلَه, আল’হামদুলিল্লাহ
সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্য

৪ নং জিকিরঃ

اَللّٰهُ أَكْبَرُ , আল্লাহু আকবার
আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটিঃ ‘সুব’হা-নাল্লাহ’, ‘আল-’হামদুলিল্লাহ’, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, এবং ‘আল্লাহু আকবার’।…” (মুসলিম ৩/১৬৮৫)

(একদিন) গরীব সাহাবীগণ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ ! ধনী লোকেরা তো উচ্চমর্যাদা ও চিরস্থায়ী নি’য়ামত নিয়ে আমাদের থেকে এগিয়ে গেলেন।

তিনি ﷺ জিজ্ঞেস করলেনঃ তা কেমন করে?

তাঁরা বললেনঃ আমরা যে রকম সলাত আদায় করি, তাঁরাও সে রকম সলাত আদায় করেন। আমরা যেমন জিহাদ করি, তাঁরাও তেমন জিহাদ করেন এবং তাঁরাও তাদের অতিরিক্ত মাল দিয়ে সদাকাহ-খয়রাত করেন; কিন্তু আমাদের কাছে সম্পদ নেই।

তিনি ﷺ বললেনঃ আমি কি তোমাদের একটি ‘আমাল বলে দেব না, যে ‘আমাল দ্বারা তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের মর্যাদা লাভ করতে পারবে, আর তোমাদের পরবর্তীদের চেয়ে এগিয়ে যেতে পারবে, আর তোমাদের মত ‘আমাল কেউ করতে পারবে না, কেবলমাত্র যারা তোমাদের মত ‘আমাল করবে তারা ব্যতীত। সে ‘আমাল হলো তোমরা প্রত্যেক সালাতের পর ১০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ১০ বার ‘আলহামদু লিল্লাহ’ এবং ১০ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করবে। (বুখারী ৬৩২৯)

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “আমি ‘সুব’হা-নাল্লাহ’, ‘আল-’হামদুলিল্লাহ’, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে এত বেশি পছন্দ করি যে, এগুলো বলা আমার কাছে পৃথিবীর বুকে সূর্যের নীচে যা কিছু আছে, সেই সবকিছু থেকে বেশি প্রিয়।” (মুসলিম ৪/২০৭২)

বিভিন্ন হাদীসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন –

‘এ বাক্য চারটির প্রতিটি বাক্য একবার বললে জান্নাতে একটি করে বৃক্ষ রোপণ করা হয়।’ (মুনযিরী, আত-তারগীব ২/৪০৭-৪০৮, মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/৮৮-৯০)

‘এ বাক্যগুলোর প্রতিটা বাক্য একবার জিকির করা, একবার আল্লাহর ওয়াস্তে দান করার সমতুল্য।’ (মুসলিম ২/৬৯৭)

‘এ বাক্যগুলো কিয়ামতের দিনে বান্দার আমলনামায় সবচেয়ে বেশি ভারী হবে।’ (আন-নাসাঈ ৬/৫০…)

‘এ বাক্যগুলোই জাহান্নামের আগুন থেকে মুমিনের ঢাল।’ (আন-নাসাঈ, ৬/২১২…)

‘গাছে ঝাঁকি দিলে যেমন পাতাগুলো ঝরে যায়, একইভাবে এ বাক্যগুলো বললে বান্দার গুনাহ ঝরে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ ৩/১৫২…)

‘আল্লাহ এ চারটি বাক্যকে বেছে পছন্দ করে নিয়েছেন। এ বাক্যগুলোর যেকোন একটি বাক্য একবার বললে আল্লাহ ২০টি সাওয়াব দান করবেন এবং ২০টি গুনাহ ক্ষমা করবেন। আর এভাবে যে বেশি বেশি জিকির করবে, সে মুনাফিকী থেকে মুক্তি লাভ করবে।’ (আন-নাসাঈ ৬/২১০…)

৫ নং জিকিরঃ

’আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে সালাত আদায় করেছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি বলে উঠলঃ

اللهُ أكْبَرُ كَبِيرًا، والحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا، وسُبْحانَ اللهِ بُكْرَةً وأَصِيلًا

“আল্লাহু আকবার কাবীরা- ওয়াল হামদুলিল্লা-হি কাসীরা- ওয়া সুবহা-নাল্ল-হি বুকরাতান ওয়া আসীলা-”

অর্থাৎ- আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, বড়। সব প্রশংসা আল্লাহর। আর সকাল ও সন্ধ্যায় তারই পবিত্রতা বর্ণনা করতে হবে।

(সালাত শেষে) রসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, এ কথাগুলো কে বলল? সবার মধ্যে থেকে জনৈক ব্যক্তি বললঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি ঐ কথাগুলো বলেছি। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কথাগুলো আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কারণ কথাগুলোর জন্য আসমানের দরজা খুলে দেয়া হয়েছিল। (মুসলিম ৬০১)

৬ নং জিকিরঃ

لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ ، لَهُ الـمُـلْكُ وَ لَهُ الحَمْدُ وَ هُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ

লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়া’হদাহু, লা- শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল ‘হামদু, ওয়া হুয়া ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।

নেই কোন মা’বুদ আল্লাহ ছাড়া, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

“যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা…ক্বাদীর’ জিকিরটি একবার বলবে, সে একজন বা দু’জন ক্রীতদাস মুক্ত করার সমান সাওয়াব পাবে।” (আল-মু’জামুল কাবীর ৪/১৬৪)

“যে ব্যক্তি এ জিকিরটি ১০ বার বলবে, সে ৪ জন ইসমাঈল বংশীয় ক্রীতদাসকে মুক্ত করার সাওয়াব অর্জন করবে।” (বুখারী ৫/২৩৫১)

“যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০ বার এ জিকিরটি পড়বে, তার ১০টি ক্রীতদাস মুক্ত করার সওয়াব হবে। তার জন্য ১০০টি সাওয়াব লেখা হবে এবং ১০০টি গুনাহ মিটিয়ে ফেলা হবে। ওই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান থেকে রক্ষিত থাকবে। কোনো মানুষ তার চেয়ে উত্তম সওয়াবের কাজ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ওই ব্যক্তি সক্ষম হবে, যে তার চেয়ে এই আমল বেশি পরিমাণে করবে।” (বুখারি ৩২৯৩, মুসলিম ৪৮/১০ হাঃ ২৬৯১, আহমাদ ৮০১৪)

“যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার (সবমিলিয়ে মোট ৯৯ বার) পাঠ করবে, এরপর একশ’ পূর্ণ করতে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ বলবে, তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে – যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৯৭)

৭ নং জিকিরঃ

سُبْحَانَ اللّٰهِ وَبِحَمْدِهِ, সুব’হা-নাল্লা-হি ওয়া বি’হামদিহী

আল্লাহ সকল ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে, পবিত্র এবং সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা তাঁরই জন্য

سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيم, সুব’হা-নাল্লা-হিল ‘আযীম

আল্লাহ সকল ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, পবিত্র ও মহামহিমান্বিত

“দু’টি বাক্য জিহবায় উচ্চারণের জন্য খুবই হালকা, আর কিয়ামাতের দিন মিজানের পাল্লায় খুবই ভারী এবং আল্লাহর নিকট প্রিয়ঃ ”সুব’হা-নাল্লা-হি ওয়া বি’হামদিহী, সুব’হা-নাল্লা-হিল ‘আযীম।” (বুখারী ৬/২৭৪৯, মুসলিম ৪/২০৭২)

৮ নং জিকিরঃ

لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِٱللَّٰهِ

লা- হাওলা ওয়ালা- কুওয়্যাতা ইল্লা- বিল্লাহ

আল্লাহ ছাড়া (কারও) কোনও শক্তি-সামর্থ্য নেই

একবার এক সাহাবীকে রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি তোমাকে এমন একটি বাক্যের সন্ধান দেবো না, যা হলো জান্নাতের একটি ভান্ডার স্বরূপ?” তিনি (সাহাবী) বললেনঃ “অবশ্যই ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক!” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ (সেটি হলো) ‘লা- হাওলা ওয়ালা- কুওয়্যাতা ইল্লা- বিল্লাহ’। (বুখারী ৪২০২)

দু’আ

১. রাসুলুল্লাহর ﷺ জন্য দু’আ (দুরূদ)

আবু তালহা (রা) বলেন, একদিন সকালে রাসুলুল্লাহকে ﷺ অত্যন্ত আনন্দিত দেখা গেল। সাহাবীরা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আপনি এত আনন্দিত!” তিনি ﷺ বললেনঃ

“হ্যাঁ! আমার রাব্বের পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা এসে আমাকে বলেছেনঃ আপনার উম্মতের কোন ব্যক্তি যদি আপনার উপর দুরূদ পাঠ করে,তাহলে আল্লাহ তাঁর জন্য ১০টি সাওয়াব লিখবেন, তাঁর ১০টি গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন, তাঁর জন্য দশটি মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন এবং তাঁর জন্য ঠিক অনুরূপ রহমত ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিবেন।” (মুসনাদে আহমাদ ৪/২৯, আলবানী, সহীহুত তারগীব ২/১৩৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে দুরূদ পড়া শিখিয়েছেন। যেমন, সালাতে পঠিত দুরূদে ইবরাহীম। এছাড়াও তিনি আমাদেরকে সংক্ষিপ্ত দুরূদও শিক্ষা দিয়েছেন। যথাঃ

اللَّهُمَّ صل عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ

আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদ, ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদ

হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপরে সালাত প্রেরণ করুন। (আন-নাসাঈ ১২৯২)

২. ক্ষমা চাওয়ার দু’আ

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ, আস্তাগফিরুল্লাহ

আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি

আনাস (রা) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে ﷺ বলতে শুনেছি, আল্লাহ বলেনঃ

“হে আদম সন্তান, তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে ও আমার করুণার আশা করবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করব। তুমি যাই কর না কেন, কোন কিছুই পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান, যদি তোমার পাপ আসমান স্পর্শ করে, এরপরেও তুমি ইস্তিগফার কর বা ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, কোন পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান, তুমি যদি পৃথিবী পূর্ণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে হাজির হও, কিন্তু শিরক থেকে মুক্ত থাক, তাহলে আমি পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা তোমাকে প্রদান করব।” (তিরমিযী ৫/৫১২…)

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

আস্তাগফিরুল্লা-হাললাযী লা-ইলা-হা ইল্লা-হু, আল ‘হাইউল কাইউমু, ওয়া আতূবু ইলাইহি

আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি, যিনি ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও সর্ব-সংরক্ষক, এবং তাঁর কাছে তাওবা করছি

“যে কেউ ‘আস্তাগফিরুল্লা-হাললাযী লা-ইলা-হা ইল্লা-হু আল ‘হাইউল কাইউমু ওয়া আতূবু ইলাইহি’ তিন বার বলে, তাহলে তাঁর গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেয়া হবে, যদিও সে জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে আসার মতো কঠিন পাপও করে থাকে।” (আবু দাউদ ২/৮৫, আলবানি, সহীহাহ ২৭২৭…)

৩. সবকিছুর (নিরাপত্তার) জন্য যথেষ্ট যে দু’আ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি সকাল ও বিকালে ‘কুল হুআল্লাহু আহাদ’(সূরা ইখলাস), ও সূরা ফালাক, ও সূরা নাস তিনবার করে বলবে, এটাই তার সবকিছুর (নিরাপত্তার) জন্য যথেষ্ট হবে।” (আবূ দাউদ ৪/৩২২, নং ৫০৮২; তিরমিযী ৫/৫৬৭, নং ৩৫৭৫। আরও দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ৩/১৮২)

৪. জাহান্নাম থেকে আশ্রয় এবং জান্নাত চাওয়ার দোআ

اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ النَّارِ

আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ‘উযু বিকা মিনান্নার

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। (আবূ দাউদ, নং ৭৯২; ইবন মাজাহ্‌ নং ৯১০, ২/৩২৮।)

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে জান্নাতের প্রত্যাশা করে; জান্নাত বলবে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। আর যে ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করবে; জাহান্নাম বলবে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও। (তিরমিযী ৫৫২১, নাসায়ী ৫৫২১, সহীহ ইবনু হিববান ১০৩৪, সহীহ আল জামি‘ ৬২৭৫)

৫. মৃত্যুর পর প্রশান্ত জীবন লাভের জন্য দু’আ

اَللّٰهُمَّ أَسْــــأَلُكَ بَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ

আল্লা-হুম্মা আসআলুকা বারদাল ‘আইশি বা‘দাল মাওত

হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট মৃত্যুর পর প্রশান্ত জীবন চাই। (নাসাঈ ৩/৫৪, ৫৫, নং ১৩০৪…)

৬. ঈমানের জন্য দু’আ

اَللّٰهُمَّ زَيِّنَا بِزِيْنَةِ الْإِيْمَانِ

আল্লা-হুম্মা যাইইন্না বিযীনাতিল ঈমান

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ঈমানের সৌন্দর্যে সৌন্দর্যমণ্ডিত করুন। (নাসাঈ ৩/৫৪, ৫৫, নং ১৩০৪; আহমাদ ৪/৩৬৪, নং ২১৬৬৬)

৭. তাক্বওয়ার জন্য দু’আ

اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا

আল্লাহুম্মা আ-তি নাফসী তাক্বওয়া-হা ওয়া যাক্কিহা-

হে আল্লাহ! আপনি আমার নফসে (অন্তর) তাকওয়া দান করুন এবং একে পরিশুদ্ধ করে দিন। (মুসলিম ২৭২২)

৮. সহজ হিসাবের জন্য দু’আ

’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কোন কোন সালাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেনঃ

اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرً

আল্লাহুম্মা হা-সিবনী হিসা-বাই ইয়াসীরা

হে আল্লাহ! আমার কাছ থেকে সহজ হিসাব নিও।

আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! সহজ হিসাব কি? তিনি ﷺ বললেন, আল্লাহ তার বান্দার ’আমলনামার প্রতি তাকানোর সাথে সাথে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন। হে ’আয়িশাহ্! জেনে রাখ, সেদিন যার হিসাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, সে নিঃসন্দেহে ধ্বংস হবে। (বুখারী ১০৩, মুসলিম ২৮৭৬)

৯. অন্তরকে দ্বীনের উপরে দৃঢ় রাখার দু’আ

শাহর ইবন হাওশাব (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেনঃ আমি উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা কে বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন অধিকাংশ সময় তিনি কি দুয়া করতেন?

তিনি বললেনঃ তাঁর অধিকাংশ দু’আ ছিলঃ

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা
 
"হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর তুমি তোমার দীনে সুদৃঢ় রাখ।" (সহীহ, যিলালুল জান্নাহ ২২৩, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩৫২২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা কোনো ব্যক্তি সর্বদা পালন করে থাকে, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।” [সহিহ মুসলিম : ২৮১৮]
“তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহর জিকির বা স্মরণে সবসময় ভেজা থাকে।” (তিরমিযী ৩৩৭৫)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জিহ্বাকে সর্বদা উনার জিকিরে আর্দ্র রাখার তৌফিক দান করুন। এবং আমাদের সবাইকে অপ্রয়োজনীয় অসার কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে অবসর সময়ে, হাঁটাচলা, বসা, শোয়া অবস্থায় নিয়মিত জিকিরে অভ্যস্ত হওয়ার সামর্থ্য দান করুন।

আ-মীন।

🖊 মোহাম্মদ তোয়াহা আকবর
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url