সাদা এপ্রোন-৪

 সাদা এপ্রোন পার্ট ৪

_

লুৎফুস সালাম ছাত্রাবাসের পেছনের প্যাঁচানো সিড়ি বেয়ে দু'তলায় উঠছি। সংকীর্ণ এই সিঁড়ির গন্তব্য দু'তলা পর্যন্তই। সিঁড়ি যেখানে শেষ, ঠিক সেখানে বামে সংকীর্ণ একটা রুম। এত সংকীর্ণ একটা রুমে কোন ছাত্র থাকতে চাইবে না। সিনিয়রদের কাছে ধর্ণা দিয়ে প্রশস্ত কোন রুমে সিটের ব্যবস্থা করে নেবে। ঐ বিশেষ সিনিয়রদের কাছে আবদারের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি বলে এই রুমে ঠাঁই হয়েছে এক হুজুরের। বর্ষায় অজোরধারা শুরু হলে জানালার ফাঁক গলে বইপত্র ভিজে যাওয়া একটা কমন ব্যাপার। তাই প্লাস্টিক ব্যাগ মুড়িয়ে বইগুলো সযতনে সাজিয়ে রাখতে হয় তাকের উপর। পানজাবীগুলো হ্যাংগারে ঝুলিয়ে দেয়ালের কোন পেরেকে কৌশলে বসিয়ে দিতে হয়। এই পিচ্ছি রুমে আলনা ঢুকালে খাট বসবে কই?

সংকীর্ণ সিঁড়ির শেষ মাথায় দেয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে আয়েশ করে বসা যায়। ঠিক সে জায়গায় আয়েশী ঢঙ্গে হেলান দিয়ে আমার এক ইয়ারমেট সূরা কাফিরুন পড়ছে। বিশুদ্ধ তিলাওয়াত। বুঝা যায়, ছোটবেলায় পরিবারের কর্তাগন কুরআন শেখানোর ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। মোটামুটি দ্বীনদার ফ্যামিলির সন্তান না হলে এই সৌভাগ্য হয় না।

কুরআন তিলাওয়াতের সময় সাধারণত ক্বারীর একটা ভক্তিপূর্ণ চেহারা হয়। কারণ সে যে রবের কালাম পড়ছে। আমার বন্ধুর চেহারায় সেই ভক্তিটা অনুপস্থিত। এর স্থলে জায়গা করে নিয়েছে অবজ্ঞাপূর্ণ দুষ্টুমি। সে প্রতিটি আয়াত শেষে নিজের পক্ষ থেকে পেশ করছে অনুবাদ। সে অনুবাদে মেধার তো ছাপ আছে, কিন্তু ঈমানের ছাপ নেই। কুরআনের আয়াতের অর্থবিকৃতি ঘটিয়ে হাস্যরসের উপাদান যোগ করে এক বিকৃত স্বাদ সে আস্বাদন করছে। রবের কালামের সাথে ঠাট্টা প্রকাশ করে দিচ্ছে তার ক্বলবে ঠাঁই নেয়া কুফরের অন্ধকার। 

আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কালাম, আল্লাহর কোন বিধান নিয়ে ঠাট্টা সুস্পষ্ট কুফর। ঠাট্টা করার সময় কুফরীর নিয়ত না থাকলেও কুফর। 'আমি একটু মজা করছিলাম' - বলে ওজরখাহী করার সুযোগ নেই। এই কুফর কুফরে আকবার। এ তার অতীতের সব নেক আমলকে নষ্ট করে দেবে। এ প্রকাশ্য ইরতিদাদ। এর শাস্তি ভয়াবহ। 

আমি তার দুঃসাহস দেখে আশ্চর্য হচ্ছিলাম। ক্যাম্পাসে মাত্র এক বছরে কী জঘন্য পরিবর্তনই না তার হয়েছে। অন্তর থেকে সম্পূর্ণ উধাও হয়েছে দ্বীনের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তার কাছে কি গাশতের জামাত যায় নি? তার ইয়ারের দুই হুজুর দিলের সব ব্যথা জমা করে তাকে বার বার কি বুঝানোর চেষ্টা করে নি এর ভয়াবহ পরিণাম? লাভ খুব বেশি হয় নি। অজ্ঞতা ও দুনিয়াপ্রেমের নেশা এবং উদ্ধত কিছু সিনিয়রের আস্কারা তার দুঃসাহসকে পৌঁছে দিয়েছে চূড়ায়।

মাত্র একটা বছরের অসৎসঙ্গ তাকে পৌঁছে দিয়েছে পতনের শেষ সীমানায়। তার দ্বীনদার বন্ধুরা তাদের সামর্থ্যের সবটুকু শেষ করে এখন কুফরহেতু ঘৃণা সত্ত্বেও দিলভাঙ্গা দোয়া করে চলেছে তার ফেরার অপেক্ষায়। হ্যা! একদিন সে ফিরেছিল, আল্লাহর রাস্তায় তিনটি দিনের জন্যও সে গিয়েছিলো। কিন্তু এই ফেরা ছিলো চরম মূল্য দেয়ার পর, নিজের আকাশচুম্বী আশার ফানুস নিভে যাওয়ার পর। তবুও তো সে ফিরতে পেরেছিলো। সবাই কি ফিরে? সবাই কি পায় ফেরার অবকাশ?

একদিন নতুন ভর্তি হওয়া এক জুনিয়রের সাথে কথা হচ্ছিলো। কথাপ্রসঙ্গে এই বাক্যটি তার মুখ দিয়ে বের হলো, " ভাইয়া! অন্যরা মাথার উপর ছড়ি ঘুরাবে, সেটা তো বরদাশত হবে না!" অর্থাৎ তার ইয়ারমেটদের মধ্যে অন্যরা নেতা হয়ে যাবে, আর সে কেবল চুপে চুপে দেখে যাবে - এ কি করে হয়! ছড়ি ঘুরানোর এই নেশা বড় ভয়ঙ্কর। এই নেশা তাকে চালিতে করবে। এর জন্য সব দিতে প্রস্তুত থাকবে। সিনিয়রদের সবকিছু দিয়ে খুশি করবে। যদি লাভ করতে পারে ছড়ি ঘুরানোর এই আরাধ্য অধিকার। বড় বাস্তবতা-ভুলানো এই নেশা।

সদ্য সাদা এপ্রোন গায়ে জড়ানো ছোটভাইটি! এভাবেই তলিয়ে যেতে অনেককে দেখলাম। নিজের উদ্দেশ্য ভুলে, নিজের বাবা-মার স্বপ্ন ভুলে হঠাৎ তার মাথায় ঢুকেছে অসুস্থ লক্ষ্য। এই লক্ষ্য কেবল তার পড়াশুনা ছিনিয়ে নেয় নি, অনেক ক্ষেত্রে ছিনিয়ে নিয়েছে ক্বলবের নূরটুকুও। হারানোর এই ব্যাপ্তি পরিমাপের অনেক অনেক উর্ধ্বে।

পড়াশুনার তারগীব তুমি অনেক শুনবে। সেই তারগীব আমি তোমাকেও দিতে চাই। কিন্তু এর আগে, এর বেশ আগে আমি তোমাকে তোমার আসল পুঁজির ব্যাপারে সতর্ক করতে চাই। আমি চাই তুমি আগেই কুফর ও ইরতিদাদের ব্যাপারে ইমিউনাইজড হও। তোমার শেখা হোক ঈমান। তোমার শপথ হোক দৃঢ়। কারণ আমি জানি, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এবং ইয়াকীন ও ইলমের পুঁজি ছাড়া তুমি এখানে এক মূহুর্তও চলতে পারবে না। দ্বীনদারীর ক্ষেত্রে এখানে মাঝামাঝি কিছু আমি দেখি নি। নিজেকে পরিবেশের হাতে সোপর্দ করে দিয়ে নিজের হালকা-পাতলা দ্বীনদারীও এখানে টিকিয়ে রাখা যায় না। এই ক্ষেত্রটিতে এখানে আমি বরাবরই দেখেছি "All or None law." স্রোতের বিপরীতে ইফোর্ট দিয়ে কিছু মানুষ হয়েছে আগুয়ান। আর পরিবেশের হাতে সঁপে দিয়ে বেশিরভাগই হয়েছে নিঃস্ব।

হে আমার ভাই! হে আমার বোন! এখানে আসার আগেই তুমি ঠিক করে নাও কোন পরিণতিটা তুমি বরণ করবে। কুফরের অন্ধকার, নাকি ঈমানের তেজোদীপ্ত আলোক?


-মুফতি ডা. মাসীহুল্লাহ ভাই

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url