সাদা এপ্রোন-৩

 সাদা এপ্রোন পার্ট ৩

_

মেডিকেলে ভর্তি হওয়া নামাজী ছেলেটা কিভাবে ধীরে ধীরে নামাজের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায়, তা খুব দেখেছি। আবার দেখেছি নামাজের ব্যাপারে বেখবর ছেলেকে পাক্কা মুসল্লী হতে। ফার্স্টইয়ার হোস্টেলে কোন রকমে গনরুমে ঠাঁই পাওয়া ছেলেটির রাতগুলো যেন বিভীষিকা। এত মানুষের হুড়োহুড়িতে কি ঘুম আসতে চায়! প্রথম প্রথম আইটেমের প্রিপারেশন নিতে রাত গভীর হয়ে যায়। কখনও কখনও সিনিয়রদের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে ডাক পড়ে। সেই ডাকে হাজিরা শতভাগ কনফার্ম করতে গিয়ে প্রায়ই ফিরতে দেরি হয়। ওখানে অধিকাংশই যে নিশাচর। যে ছেলেটির গত একটা বছর ফজরের জামাত কখন ছুটেছে মনে নেই, তারও জামাত ছুটতে থাকে। বেশিরভাগেরই ঘুম ভাঙ্গতেই সূর্যের সাথে দেখা হয়ে যায়। কোন মতে রেডি হয়ে নাস্তার ফিকিরের চেয়ে আটটার লেকচার ধরার ফিকির বড় হয়ে যায়।


আড়াইটার আগে ক্লাস শেষ না হওয়ায় যোহরের জামাত মিস হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। দুপুরের খাবার খেতে গেলে তো নামাজই কাজা। রাতের ঘুমের কাজা দিতে গিয়ে আসর চলে যায় ঘুমে, বিকেলের নাস্তা ও আড্ডা সারতে সারতে মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ, এরপর এশার সময় তো নামাজের মানসিকতাটুকুও থাকে না। এভাবে কত পাক্কা মুসল্লী নামাজে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম একটু অনুশোচনা থাকলে আস্তে আস্তে তাও থাকে না।


এর মাঝে কিছু আল্লাহর বান্দা এমনও থাকে, যারা হাজার সীমাবদ্ধতায়ও রাত দশটার বিছানায় যায়। ঘুম আসুক না আসুক নিজামুল আওকাত ধরে রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। এর মাঝে তারা আবার অন্যকে নামাজী বানানোর কৌশিশও করে। নিয়মিত হোস্টেলে আযান ইকামাত দিয়ে নামাজের ব্যবস্থা করে। জামাতের আগ মূহুর্তে পুরো হোস্টেলে চক্কর লাগায়। যোহরের জামাত যেন ছুটে না যায়, এর জন্য দু'তিনজন মিলে আগেই প্রোগ্রাম বানিয়ে রাখে। খাওয়ার আগেই নামাজ সেরে নেয়। আসর শেষে বন্ধুদের সাথে দাওয়াতের নিয়তে দেখা সাক্ষাত করে। এই লোকগুলোর প্রচেষ্টার বরকতে এমন কিছু লোকও নামাজী হয়ে যায় যারা আগে নামাজে অভ্যস্ত ছিলেো না। কোন ওয়াক্তে এক ফাঁকে নামাজের পর পর ফাযায়েলের তালীমও চলে। নামাজের ফাযায়েল নতুন নামাজীদের নামাজের কোয়ালিটি বৃদ্ধি করতে থাকে। 

একজন ছাত্রকে শুরুতেই ঠিক করতে হবে সে কোন দলে থাকবে। ভর্তি হতেই যদি নামাজই হারিয়ে যায়, ঈমান-আকীদার সংরক্ষণ তো আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। নামাজ যেন আমার প্রতিদিনের ঘড়িতে পরিণত হয়। নামাজকে কেন্দ্র করেই যেন আমার অন্য সব কাজ আবর্তিত হতে থাকে। মজবুত সংকল্প, অন্যকে নামাজী বানানোর দাওয়াত নিজের জন্য টিকে থাকার কারণ হবে। এভাবে নামাজকে কেন্দ্র করে একটা দল গড়ে উঠলে নিজেদের অন্যান্য দ্বীনি বিষয়গুলোর বাস্তবায়নও সহজ হতে পারে। নিজেদের উদ্যোগে হতে পারে প্রতিদিন কুরআন শেখার মজলিস। আস্তে আস্তে ফরজে আইন ইলমের জন্য ব্যবস্থা করে ফেলা যায়। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে দলবেঁধে কোন আল্লাহওয়ালা আলিমের সাহচর্যের সুযোগও মিলতে পারে। ইসলাহী মজলিস, দ্বীনি মাদারিস, তাবলীগি মারকাযগুলো শুরুতেই চিনে নিলে নিজেদের দ্বীনি তরক্কীর শত রাস্তা খুলবে। মসজিদ বা নামাজের মুসাল্লাকে কেন্দ্র করে শুরু হতে পারে প্রতিদিনের দাওয়াতের কাজ। একটানা দু'তিনটা দিন ছুটি পেলে হতে পারে তাবলীগি সফরও। এভাবেই দ্বীনদার শ্রেণী নিজেদের দ্বীনি মাশগালায় প্রাণ জাগাতে পারে। আর যদি তা না হয়, আমাদের দ্বীন হয়ে যাবে গৌন। এক সময় এমন হবে, ফরজ আমলের কথা মুখে আনাও হয়ে পড়বে অসম্ভব। পড়াশুনা, আইটেম, খেলাধুলা ও কালচারাল প্রোগ্রামের ভিড়ে দ্বীন হয়ে পড়বে অপরিচিত। 

             

-মুফতি ডা: মসীহুল্লাহ ভাই

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url