।। কমিউনিটির ডাক্তার ভাবনা ।।

এমবিবিএস/বিডিএস পাশ করার পর যেখানে একটা ছেলে/মেয়ের খুশিতে আত্মহারা হবার কথা সেখানে তাদের চেহারাগুলো দুশ্চিন্তার কালো মেঘে ছেয়ে থাকে। এতো কষ্ট, এতো পরিশ্রম, এতো স্যাক্রিফাইস, এতো অধ্যবসায়, এতো চাপ, এতো অবসাদ-বিষাদ-বিষণ্ণতার পাহাড় ঠেলে চিকিৎসক হলো ঠিকই কিন্তু সে খুশিটা কয়েকটা দিনও থাকে না। ভবিষ্যতের কণ্টকাকীর্ণ দুর্গম পথের ভাবনা তাদেরকে আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলে। এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণটি তার নিজস্ব চারপাশ। পরিবার থেকে শুরু করে কাছের কিংবা দূরের আত্মীয়, পাড়াপ্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, ক্লাসমেট, সিনিয়র, জুনিয়র, র‍্যান্ডম পিপল তার মাথাটা খারাপ করে ফেলে। সবাই না তবে অধিকাংশই। একই জিজ্ঞাসা যেন সবার,

"বিসিএস হয়েছে? পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনে চান্স হয়েছে? হয়নি? কবে হবে? আর কতো দিন এভাবে থাকবে? তোমার বন্ধুদের তো হয়ে গেলো। তোমার জুনিয়রদের তো হয়ে গেলো।"

"ও বিসিএস হয়েছে, পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশানে এখনও ঢোকোনি? পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশান না করলে হবে?"

"ও পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশানে ঢুকেছো, বিসিএস হয়নি? কী বলো? বাংলাদেশে বিসিএস করা ছাড়া ডাক্তারদের ভাত আছে না কি? না খেয়ে থাকবে তো। বেসরকারি চাকরি কোনো চাকরি হলো? আজ আছো তো কাল ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।" 

"ও বেসিক সাবজেক্টে ঢুকেছ? ক্লিনিক্যালে চান্স পাওনি? ডাক্তার হয়ে যদি রোগীই না দেখো এতো কষ্ট করে ডাক্তারি পড়লে কেন?"

" কী বললে? প্রশাসনিক লাইনে যাবে? তার মানে ঢাকার বাইরে কাটিয়ে দেবে জীবনের বড়ো অংশ? ডাক্তার হয়েছ ডাক্তারি না করে ডিগ্রি না করে গ্রামের পাতি নেতাদের তোয়াজ করে জীবন কাটিয়ে দেবে?"

"ওহ মেডিসিনের সাবজেক্টে ঢুকলে? ধুর আজকাল হাতের কাজ ছাড়া কোনো পাত্তা আছে না কি? টুকটাক কয়টা রোগী দেখে কয় টাকা পাবে? "

"এই সাবজেক্টে কী পরিমাণ কমপিটিশন জেনে এসেছ তো? এই সাবজেক্টে পাশের হার যে ৪-৫% জেনে এসেছ তো?"

" কী, সার্জারির সাবজেক্টে ঢুকলে? দালাল ছাড়া তো রোগী না পেয়ে না খেয়ে থাকবে। কেইস তো সব সিনিয়ররাই পায়।"

"কী গাইনিতে ঢুকেছ? রাত-বিরেতে হাসপাতালে পড়ে থাকবে? তোমার সন্তানকে কে দেখবে? পরিবারকে দেখা কি তোমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?"

"আরে শুধু একটা ডিগ্রি দিয়েই কি হয় না কি? এটা কমপ্লিট করেছো এবার ওটা করে ফেলো। দেরি কোরো না।"

"আরে শুধু দেশি ডিগ্রি থাকলে হবে? বিদেশি একটা ডিগ্রি নিবে না? বিদেশি ডিগ্রি ছাড়া বড়ো ডাক্তার হয় না কি কেউ?"

এদিকে ডাক্তার হওয়া মাত্রই প্রতিটি ডাক্তারকে পঞ্চাশোর্ধ স্যার-ম্যাডামদের মতো ভাবা শুরু করে সমাজের মানুষজন। ভাবে দিনে-রাতে প্র‍্যাক্টিস। অর্থাৎ তাদের শুধু টাকা আর টাকা। কিন্তু নবীন চিকিৎসকদের হাতে থাকে না তেমন কোনো অর্থকড়ি। অর্থনৈতিক চাপ যে কতো বড়ো চাপ তা হাড়ে হাড়ে টের পায় তারা। টাকার পেছনে ছুটতে গেলে হয় না পড়াশোনা আবার ধ্যানজ্ঞান দিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে হয় না অর্থ উপার্জন। এ যেন দোধারী ছুরি। কাটবেই। এদিকে বাড়তি কিছু উপার্জনের জন্য একটু আধটু ব্যবসা করলে শুনবে, এতো কষ্ট করে এতো টাকা খরচ করে ডাক্তারি না পড়ে ফলের দোকান দিয়ে বসলেই তো হতো। শখের বশে টুকটাক লেখালেখি বা সৃজনশীল কাজ করলে শুনবে, ডাক্তার হওয়ার কী দরকার ছিল কবি বা চিত্রশিল্পী হলেই তো হতো।

আগের কথায় আসি। বিসিএস বা কোর্সে চান্স না পাওয়া পর্যন্ত তো চোখের পানি দিয়ে বইয়ের পাতা ভেজে সকাল দুপুর রাত। কয়েক বছরের সাধনায় সরকারি চাকরিতে ঢুকে নানা নিয়ম ও জটিলতায় ক্যারিয়ার তৈরির পথ হয়ে যায় দীর্ঘায়িত। অনেকক্ষেত্রেই থাকতে হয় পরিবার থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে। ওদিকে অনেক কষ্টেসৃষ্টে ডিগ্রিতে চান্স পাওয়া গেলেও একদিকে কোর্সের পড়াশোনা, পুরোদমে ডিউটি, ফলো-আপ, রাউন্ড, প্রেজেন্টেশন, পরীক্ষা, বকাঝকা-অপমান; আরেকদিকে উপার্জনের চিন্তায় সংসার চালানোর চিন্তায় দিশেহারা। পারিবারিক জীবন এলোমেলো বিপর্যস্ত। গুরুত্বপূর্ণ সব পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠান মিস করে স্বজন-প্রতিবেশীর নিকট অসামাজিক উপাধি, নেগেটিভ ইমপ্রেশন--শুধু পড়াশোনাই বোঝে জগতের আর কোনো দিক বোঝেও না খেয়ালও নেই কোনোদিকে। থাকে না খাওয়াদাওয়ার নিয়মিত রুটিন। ঘুমের স্বল্পতায় শরীর ও মন থাকে না চাঙ্গা। দুশ্চিন্তা-স্ট্রেস-হতাশায় অল্প বয়সে শরীরে নানা রোগের বাসা। ছুটি একান্ত অপ্রতুল থাকায়, কর্মঘণ্টা অনেক বেশি থাকায়, অনেক স্ট্রেসফুল ডিউটি হওয়ায় শরীরে ভর করে ক্লান্তি, মনে ভর করে অবসাদ। কর্মপরিবেশ প্রতিকূল থাকায় এবং কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না থাকায় হারায় কাজের স্পৃহা-উদ্দীপনা।

দিনের পর দিন কি এভাবেই চলবে এতো বড়ো একটা কমিউনিটির জীবনচক্র? এ থেকে আদৌ কি কোনো উত্তরণের পথ আছে?

Collected
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url