দ্বীনদারীর মিনিমাম লেভেল!!!
এক একটা দিন আমাদের জীবনের অংশ। আমাদের জীবন মানেই তো কতগুলো দিন। এ-জন্য সালাফদের কেউ বলেছিলেন, তোমার একটা দিন চলে গেলো, যেন তোমারই একটা অংশ চলে গেলো। অর্থাৎ তোমার একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেলে, একটা কিডনী বিকল হয়ে গেলে তুমি কতই না আফসোস করবে। তোমার এক একটা দিন চলে যাওয়া যেন এমনই। একটা চোখ হারানোর মতো। একটা কিডনী বিকল হয়ে যাওয়ার মতো। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ এ-জন্যই বলেছিলেন, " আমি কোন কিছুর জন্য আফসোস করি না। আমি কেবল আমার ঐ দিনটির জন্য আফসোস করি, যে দিনটির সূর্য ডুবে গেছে, কমে গেছে জীবনের আয়ু, অথচ আমার আমল বাড়ে নি।''
আমার প্রতিটি দিন আমাকে দ্বীনদারীর সাথে কাটাতে হবে। কিন্তু দ্বীনদারীর সেই মিনিমাম লেভেলটা কত? যতটুকু হলে বলা যাবে দ্বীনদার? আমি তো নিজেকে দ্বীনদার মনে করি। বাস্তবেই কি দ্বীনদারীর মিনিমাম লেভেলটা আমার আছে?
হয়তো আমার দ্বীনদারীটা বাজারের ম্যাংগো কিংবা অরেঞ্জ জুসের মতো। যেখানে অরেঞ্জ বা ম্যাংগোর ছিটেফোঁটাও নেই। আছে একটু ম্যাংগো ফ্লেভার কিংবা অরেঞ্জ ফ্লেভার। দ্বীনদারীর কোন ফ্লেভার লাগিয়ে নিয়েই আমি নিজেকে মনে করছি দ্বীনদার। দ্বীনি ইস্যুগুলোতে একটা পোস্ট প্রসব করে, কিংবা কোন দ্বীনি ভিডিও শেয়ার দিয়েই আমি দ্বীনদার। যদিওবা অনেক ক্ষেত্রেই আমার দ্বীনি পোস্টের আড়ালে বদদ্বীনি। কারও প্রতি বিদ্বেষ উগড়ে দেয়া, কোন আলিমের নিন্দা করা, অপ্রয়োজনীয় বিবাদে জড়ানো এইসব করেই নিজেকে দ্বীনদার জ্ঞান করছি। আমি কি যাচাই করেছি আমি আসলেই দ্বীনদার কিনা?
বিশুদ্ধ আকাইদের সাথে আমার আমলের মিনিমাম অবস্থা এই হবে, আমার কোন ফরজ-ওয়াজিব ছুটবে না। আমার কোন কবীরা গুনাহ হবে না। প্রতিটা দিন আমার এভাবেই ব্যয় হবে। কদাচিৎ হঠাৎ কোন ফরজ-ওয়াজিব ছুটে গেলে, কোন কবীরা গুনাহ হয়ে গেলে আমি সাথে সাথে তাওবা করবো। কখনোই এমন হবে না আমি ক্রমাগত ফরজ-ওয়াজিব তরক করেই চলেছি। কিংবা কোন কবীরা গুনাহ অনবরত করেই যাচ্ছি। এতটুকু অর্জন হলেই দ্বীনদারীর মিনিমাম লেভেলটা আমার আছে।
নিজের টাইমলাইনকে উত্তম জিনিস দিয়ে সাজিয়ে রাখা তো সহজ। কিন্তু দ্বীনদারীর এই মিনিমাম লেভেলটা প্রচেষ্টা ছাড়াই কি হাসিল করা সম্ভব?
এই হলো দ্বীনদারীর মিনিমাম লেভেল। এই লেভেলটা আমার অর্জন হলে শোকর করবো। দৃঢ় থাকার চেষ্টা করবো। ইস্তিকামাতের জন্য দোয়া করবো। আত্মতৃপ্তির শিকার হবো না। আমাকে জানতে হবে ফরজ-ওয়াজিব বলতে কোন কোন আমলকে বুঝায়। আমি জেনে নেবো কবীরা গুনাহগুলো কি কি। আমি ইমাম যাহাবী রহঃ এর আল কাবায়ের পড়ে নিতে পারি। নিজের ভেতরটা অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে সার্চ করে দেখতে পারি। বিধ্বংসী কোন কোন কবীরা গুনাহ আমার মাঝে চুপটি মেরে বসে আছে নাকি!
আমার অবহেলায় জামাত ছুটে যায়। জামাতে নামাজ পড়া ওয়াজিব। জামাত অকারণে ছুটে গেলো তো আমার ওয়াজিব তরক হলো। কবীরা গুনাহ হয়ে গেলো। আমি কারও গীবত করে ফেললাম। আমার কবীরা গুনাহ হয়ে গেলো।
আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আমাকে এই লেভেলে নিজেকে তুলতেই হবে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কার গত এক মাস জামাত ছুটে নি? আমি যেন মনে মনে বলতে পারি, আমার। দুইমাস, চারমাস, ছয়মাসের প্রশ্ন করা হলেও । আল্লাহপাক তাওফীক দিন।
কেউ যদি বলে, কার গত এক সপ্তাহে নজরের গুনাহ হয় নি? আমি যেন মনে মনে বলতে পারি, আমার। এভাবে এক মাস, দুই মাস, চার মাস, ছয় মাসের খবর জিজ্ঞেস করলেও।
নিজের উপর পাহারা বসাবো। ধীরে ধীরে নিজেকে দ্বীনদার বানাবো।
এতটুকু তো মিনিমাম। আমাকে এর উপর মজবুত ইমারত তৈরি করতে হবে। নফলের আধিক্য, তিলাওয়াতের ইহতিমাম, তাসবীহাতের পাবন্দী, নিয়মিত সাদাকা, সৎকাজের আদেশ দেয়া, দাওয়াতের কাজ করা। আস্তে আস্তে এভাবে বাড়তে থাকবে।
দ্বীনদারীর এই মিনিমাম লেভেল অর্জন ও ধরে রাখার জন্য আমাকে কষ্ট করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একবার কোন আল্লাহওয়ালার সাহচর্যে যাবো। কেমন হবে সেই আল্লাহওয়ালা আলিম? কিভাবে বুঝবো? যার কথায় ইলমের তরক্কী হয়। যাকে দেখলে আল্লাহপাকের কথা মনে পড়ে। যার আমলের দ্বারা আখিরাতের স্মরণ হয়।
আমি বড়দের কিতাব পড়বো। যাদের কিতাব তাদের ইখলাসের পরশে মুআচ্ছির। বড়ো প্রভাব বিস্তারকারী। থানবী রহঃ, শায়খুল হাদীস হঃ, তাকী ওসমানী দামাত বারাকাতুহুম। বড়দের কিতাবের আগে ছোটদের কিতাবের ভক্ত হয়ে গেলে বড়দের কিতাব পড়তে মন চাইবে না। মন মজা তালাশ করে বেড়াবে, গল্পের ধাঁচ না থাকলে তৃপ্ত হবে না। বড়দের কিতাবে এগুলো অনুপস্থিত এমন নয়। তবে উপস্থাপনার ঢঙ্গে কিছু পার্থক্য আছে বইকি।
আমি বলি, আগে বড়দের কিতাবের উল্লেখযোগ্য অংশ পড়া হয়ে যাক। অন্তর তাকওয়া ও ইখলাসের প্রভাবে আদ্র হোক, ভিজুক। দ্বীনি রুচি তৈরি হোক। তারপর না হয় অপেক্ষাকৃত ছোটদের কিতাব পড়বো। পড়বো জিজ্ঞেস করে করে। কেবল বিজ্ঞাপন দেখে নয়। আমার রুচিবান আলিম মুরুব্বি থাকবে। আমি তার পরামর্শে আগাবো।
আমি প্রতিমাসে জামাতে যেতে থাকবো। তিনদিন দেবো। তা আমাকে আস্তে আস্তে দ্বীনদারীর মিনিমাম লেভেলে তুলবে। সহজে। আমার অজান্তে। আস্তে আস্তে আরও উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে। একটা কথাও বাড়িয়ে বলা নয়। অনেকের অভিজ্ঞতা এমন। আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহওয়ালা ওলামাদের সাহচর্য ভেতরটা রঙ্গিন করবে। তাকওয়া, ইশকে মাওলা, সুন্নাহর স্বাদ, ইখলাস, যিকরের আগ্রহ তৈরি করে দেবে।
শুধু অনলাইন কেন্দ্রীক ছুটে চলা ভেতরটাকে মরুভূমি বানিয়ে দেবে। অর্জনের চেয়ে লস বেশি হবে। ভালো করে ভাবলে মনে হবে তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠছি। বানরের মতো। চারহাত উঠে, তিন হাত নেমে যায়। কখনও একদম চূড়া থেকেই পিছলে পড়ে।
হে আমার রব! আমাকে দাও ভালোবাসার স্বাদ, হেদায়াতের আলো, দৃঢ়তার শক্তি, ইলম ও হিলম। ব্যর্থ করো না কারীম!